Dhaka 7:24 pm, Wednesday, 5 August 2026

ভাত ছাড়াই ১৩ বছর, সিংড়ার স্কুলছাত্র পারভেজের ব্যতিক্রমী জীবন

  • Reporter Name
  • Update Time : 07:28:15 pm, Tuesday, 23 June 2026
  • 5 Time View

মোঃ ইব্রাহিম আলী, সিংড়া (নাটোর)প্রতিনিধি:বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাত। ভাত ছাড়া একদিন চলাও যেখানে অনেকের জন্য কঠিন, সেখানে টানা ১৩ বছর ধরে ভাতের একটি দানাও মুখে তোলেনি নাটোরের সিংড়া উপজেলার স্কুলছাত্র পারভেজ। তবে ভাত না খেলেও সুস্থ-সবল ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে নবম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী।

পারভেজ সিংড়া উপজেলার ২নং ডাহিয়া ইউনিয়নের বেড়াবাড়ি গ্রামের কৃষক বুদ্দু মোল্লার ছেলে এবং বিয়াশ উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র। নিয়মিত স্কুলে যাওয়া, পড়াশোনা, খেলাধুলা এবং বাবাকে সংসারের কাজে সহযোগিতা সবকিছুই সে করছে অন্য সাধারণ কিশোরদের মতো।

পারভেজের পরিবার সূত্রে জানা যায়, জন্মের পর মায়ের বুকের দুধ ছাড়া অন্য খাবারের প্রতি তার আগ্রহ ছিল খুবই কম। সাধারণত শিশুরা ৬-৭ মাস বয়স থেকে ভাত বা খিচুড়িতে অভ্যস্ত হয়ে উঠলেও পারভেজ কখনোই ভাতে অভ্যস্ত হয়নি। এক বছর বয়সের পর থেকে ভাতের প্রতি তার তীব্র অনীহা দেখা দেয়। জোর করে ভাত খাওয়ানোর চেষ্টা করলে সে বমি করে দিত।

পারভেজের মা পারুল বেগম বলেন, শুরুর দিকে আমরা অনেক চিন্তায় ছিলাম। জোর করে খাওয়াতে গেলে কান্না করত, বমি করত। ডাক্তার ও কবিরাজ দেখিয়েছি, কিন্তু কোনো পরিবর্তন হয়নি। একসময় আমরাও চেষ্টা ছেড়ে দিই। এখন সে ভাতের গন্ধও সহ্য করতে পারে না। আমাদের আরও দুই সন্তান আছে, তারা স্বাভাবিক খাবার খায়।

পারভেজের বাবা বুদ্দু মোল্লা জানান, ভাত না খেলেও পারভেজ বিভিন্ন খাবারের মাধ্যমে ক্ষুধা মেটায়। সকালে মুড়ি, দুপুরে সবজি দিয়ে রুটি এবং রাতে মুড়ি খেয়ে থাকে। এছাড়া কখনো সুজি, ফলমূল ও দুধ খায়। দাওয়াত বা বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলেও সে ভাত না খেয়ে মাছ, মাংস ও সবজি খায়।

তিনি বলেন,ছেলেটাকে নিয়ে আমাদের চিন্তা হয়। তবে এখন পর্যন্ত সে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠছে।

বিয়াশ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জামাল উদ্দিন বলেন, পারভেজ পড়াশোনা ও খেলাধুলায় ভালো। ভাত না খাওয়ার বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। সে নিয়মিত স্কুলে আসে এবং শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো।

সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুজাহিদুল ইসলাম খোকন জানান, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি এক ধরনের ‘ফুড ফোবিয়া’ বা নির্দিষ্ট কোনো খাবারের প্রতি তীব্র মানসিক অনীহা হতে পারে।

তিনি বলেন, মানুষের সুস্থ থাকার জন্য কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ভিটামিন প্রয়োজন। পারভেজ যেহেতু দুধ, সুজি ও ফলমূলসহ বিভিন্ন খাবার খাচ্ছে, তাই সেগুলোর মাধ্যমেও শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও ক্যালোরি পেতে পারে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে কোনো পুষ্টিগত ঘাটতি বা শারীরিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

ভাত ছাড়া ১৩ বছর পার করা পারভেজের জীবন তাই যেমন ব্যতিক্রমী, তেমনি এটি খাবারের প্রতি মানুষের ভিন্ন ভিন্ন অভ্যাস ও শারীরিক-মানসিক প্রতিক্রিয়ার একটি বিরল উদাহরণ।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

চাকরির প্রলোভনে ফাঁকা চেক-স্ট্যাম্প নেওয়ার অভিযোগ, কারারক্ষীর বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন

ভাত ছাড়াই ১৩ বছর, সিংড়ার স্কুলছাত্র পারভেজের ব্যতিক্রমী জীবন

Update Time : 07:28:15 pm, Tuesday, 23 June 2026

মোঃ ইব্রাহিম আলী, সিংড়া (নাটোর)প্রতিনিধি:বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাত। ভাত ছাড়া একদিন চলাও যেখানে অনেকের জন্য কঠিন, সেখানে টানা ১৩ বছর ধরে ভাতের একটি দানাও মুখে তোলেনি নাটোরের সিংড়া উপজেলার স্কুলছাত্র পারভেজ। তবে ভাত না খেলেও সুস্থ-সবল ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে নবম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী।

পারভেজ সিংড়া উপজেলার ২নং ডাহিয়া ইউনিয়নের বেড়াবাড়ি গ্রামের কৃষক বুদ্দু মোল্লার ছেলে এবং বিয়াশ উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র। নিয়মিত স্কুলে যাওয়া, পড়াশোনা, খেলাধুলা এবং বাবাকে সংসারের কাজে সহযোগিতা সবকিছুই সে করছে অন্য সাধারণ কিশোরদের মতো।

পারভেজের পরিবার সূত্রে জানা যায়, জন্মের পর মায়ের বুকের দুধ ছাড়া অন্য খাবারের প্রতি তার আগ্রহ ছিল খুবই কম। সাধারণত শিশুরা ৬-৭ মাস বয়স থেকে ভাত বা খিচুড়িতে অভ্যস্ত হয়ে উঠলেও পারভেজ কখনোই ভাতে অভ্যস্ত হয়নি। এক বছর বয়সের পর থেকে ভাতের প্রতি তার তীব্র অনীহা দেখা দেয়। জোর করে ভাত খাওয়ানোর চেষ্টা করলে সে বমি করে দিত।

পারভেজের মা পারুল বেগম বলেন, শুরুর দিকে আমরা অনেক চিন্তায় ছিলাম। জোর করে খাওয়াতে গেলে কান্না করত, বমি করত। ডাক্তার ও কবিরাজ দেখিয়েছি, কিন্তু কোনো পরিবর্তন হয়নি। একসময় আমরাও চেষ্টা ছেড়ে দিই। এখন সে ভাতের গন্ধও সহ্য করতে পারে না। আমাদের আরও দুই সন্তান আছে, তারা স্বাভাবিক খাবার খায়।

পারভেজের বাবা বুদ্দু মোল্লা জানান, ভাত না খেলেও পারভেজ বিভিন্ন খাবারের মাধ্যমে ক্ষুধা মেটায়। সকালে মুড়ি, দুপুরে সবজি দিয়ে রুটি এবং রাতে মুড়ি খেয়ে থাকে। এছাড়া কখনো সুজি, ফলমূল ও দুধ খায়। দাওয়াত বা বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলেও সে ভাত না খেয়ে মাছ, মাংস ও সবজি খায়।

তিনি বলেন,ছেলেটাকে নিয়ে আমাদের চিন্তা হয়। তবে এখন পর্যন্ত সে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠছে।

বিয়াশ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জামাল উদ্দিন বলেন, পারভেজ পড়াশোনা ও খেলাধুলায় ভালো। ভাত না খাওয়ার বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। সে নিয়মিত স্কুলে আসে এবং শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো।

সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুজাহিদুল ইসলাম খোকন জানান, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি এক ধরনের ‘ফুড ফোবিয়া’ বা নির্দিষ্ট কোনো খাবারের প্রতি তীব্র মানসিক অনীহা হতে পারে।

তিনি বলেন, মানুষের সুস্থ থাকার জন্য কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ভিটামিন প্রয়োজন। পারভেজ যেহেতু দুধ, সুজি ও ফলমূলসহ বিভিন্ন খাবার খাচ্ছে, তাই সেগুলোর মাধ্যমেও শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও ক্যালোরি পেতে পারে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে কোনো পুষ্টিগত ঘাটতি বা শারীরিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

ভাত ছাড়া ১৩ বছর পার করা পারভেজের জীবন তাই যেমন ব্যতিক্রমী, তেমনি এটি খাবারের প্রতি মানুষের ভিন্ন ভিন্ন অভ্যাস ও শারীরিক-মানসিক প্রতিক্রিয়ার একটি বিরল উদাহরণ।