Dhaka 12:29 am, Friday, 26 June 2026

সিসিটিভিতে ধরা পড়ল রহস্যজনক লোড-আনলোড: বেনাপোল কাস্টমসে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

মালিকুজ্জামান, যশোর জেলা প্রতিনিধি

দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে কাস্টমসের নিলাম শাখার গুদাম থেকে ত্রাণ ভাণ্ডারে পাঠানোর নির্ধারিত পণ্যের বাইরে অতিরিক্ত মালামাল পরিবহনের অভিযোগে দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিন সিপাইকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। ঘটনাটি নিয়ে বন্দরজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী ও আরিফুল ইসলাম চৌধুরী। এছাড়া সিপাই জামশেদ, মোহাম্মদ সাগর এবং হামিদুর রহমানকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২১ জুন গভীর রাতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের নিলাম শাখার গুদাম থেকে একটি কাভার্ডভ্যানে মালামাল লোড করার দৃশ্য সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। রাত ১১টা ২০ মিনিট থেকে শুরু হওয়া লোডিং কার্যক্রম প্রায় ২৩ মিনিট ধরে চলে। পরে একই গাড়িতে পুনরায় মালামাল ওঠানো এবং কিছু সময় পর আবার মালামাল নামানোর ঘটনাও সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই সময় ঘটনাস্থলে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম চৌধুরী ও সিপাই মোহাম্মদ সাগরের উপস্থিতি সিসিটিভি ফুটেজে শনাক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বিধিবহির্ভূতভাবে কিছু পণ্য পরিবহনের উদ্দেশ্যে ওই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল।

অন্যদিকে একই রাতে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বেনাপোল বাজারের দুর্গাপুর মোড় এলাকায় একটি কাভার্ডভ্যান আটক করে। পরে গাড়িটি বিজিবি ক্যাম্পে নিয়ে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত মালামাল উদ্ধার করা হয়।

কাস্টমস সূত্র অনুযায়ী, ত্রাণ ভাণ্ডারে পাঠানোর জন্য অনুমোদিত তালিকায় ছিল ৩ হাজার ২২টি শাড়ি, ৫৮টি থ্রি-পিস, ২০৮টি চাদর, ২৬৩টি কম্বল এবং ৮টি ওড়না। কিন্তু বিজিবির জব্দকৃত কাভার্ডভ্যানে এসবের বাইরে আরও বিপুল পরিমাণ পণ্য পাওয়া যায়।

তল্লাশিতে উদ্ধার হওয়া পণ্যের মধ্যে ছিল ৬ হাজার ৮টি ভারতীয় শাড়ি, ৬৩টি থ্রি-পিস, ৩৮৬টি কম্বল, ২০৮টি চাদর, ৮টি ওড়না এবং ৩৩ হাজার ২২২টি বিভিন্ন ধরনের কসমেটিকস সামগ্রী। উদ্ধারকৃত পণ্যের আনুমানিক সিজার মূল্য ২ কোটি ৬৭ লাখ ৬৫ হাজার ৩১০ টাকা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

ঘটনার সময় কাভার্ডভ্যান থেকে কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী, চালক মহসিন আলী এবং হেলপার জাহিদ হাসানকে আটক করে বিজিবি। পরবর্তীতে ঘটনার প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ দুই কর্মকর্তা ও তিন সিপাইকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন বলেন, “ঘটনাটি আমাদের নজরে এসেছে। অভিযোগের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিন সিপাইকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব আদায়কারী স্থলবন্দরে এ ধরনের অভিযোগ কাস্টমস প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বন্দর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

মহাদেবপুরে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে মোবাইল কোর্ট, অনিয়মে জরিমান

সিসিটিভিতে ধরা পড়ল রহস্যজনক লোড-আনলোড: বেনাপোল কাস্টমসে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

Update Time : 10:20:36 pm, Thursday, 25 June 2026

মালিকুজ্জামান, যশোর জেলা প্রতিনিধি

দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে কাস্টমসের নিলাম শাখার গুদাম থেকে ত্রাণ ভাণ্ডারে পাঠানোর নির্ধারিত পণ্যের বাইরে অতিরিক্ত মালামাল পরিবহনের অভিযোগে দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিন সিপাইকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। ঘটনাটি নিয়ে বন্দরজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী ও আরিফুল ইসলাম চৌধুরী। এছাড়া সিপাই জামশেদ, মোহাম্মদ সাগর এবং হামিদুর রহমানকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২১ জুন গভীর রাতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের নিলাম শাখার গুদাম থেকে একটি কাভার্ডভ্যানে মালামাল লোড করার দৃশ্য সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। রাত ১১টা ২০ মিনিট থেকে শুরু হওয়া লোডিং কার্যক্রম প্রায় ২৩ মিনিট ধরে চলে। পরে একই গাড়িতে পুনরায় মালামাল ওঠানো এবং কিছু সময় পর আবার মালামাল নামানোর ঘটনাও সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই সময় ঘটনাস্থলে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম চৌধুরী ও সিপাই মোহাম্মদ সাগরের উপস্থিতি সিসিটিভি ফুটেজে শনাক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বিধিবহির্ভূতভাবে কিছু পণ্য পরিবহনের উদ্দেশ্যে ওই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল।

অন্যদিকে একই রাতে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বেনাপোল বাজারের দুর্গাপুর মোড় এলাকায় একটি কাভার্ডভ্যান আটক করে। পরে গাড়িটি বিজিবি ক্যাম্পে নিয়ে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত মালামাল উদ্ধার করা হয়।

কাস্টমস সূত্র অনুযায়ী, ত্রাণ ভাণ্ডারে পাঠানোর জন্য অনুমোদিত তালিকায় ছিল ৩ হাজার ২২টি শাড়ি, ৫৮টি থ্রি-পিস, ২০৮টি চাদর, ২৬৩টি কম্বল এবং ৮টি ওড়না। কিন্তু বিজিবির জব্দকৃত কাভার্ডভ্যানে এসবের বাইরে আরও বিপুল পরিমাণ পণ্য পাওয়া যায়।

তল্লাশিতে উদ্ধার হওয়া পণ্যের মধ্যে ছিল ৬ হাজার ৮টি ভারতীয় শাড়ি, ৬৩টি থ্রি-পিস, ৩৮৬টি কম্বল, ২০৮টি চাদর, ৮টি ওড়না এবং ৩৩ হাজার ২২২টি বিভিন্ন ধরনের কসমেটিকস সামগ্রী। উদ্ধারকৃত পণ্যের আনুমানিক সিজার মূল্য ২ কোটি ৬৭ লাখ ৬৫ হাজার ৩১০ টাকা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

ঘটনার সময় কাভার্ডভ্যান থেকে কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী, চালক মহসিন আলী এবং হেলপার জাহিদ হাসানকে আটক করে বিজিবি। পরবর্তীতে ঘটনার প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ দুই কর্মকর্তা ও তিন সিপাইকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন বলেন, “ঘটনাটি আমাদের নজরে এসেছে। অভিযোগের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিন সিপাইকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব আদায়কারী স্থলবন্দরে এ ধরনের অভিযোগ কাস্টমস প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বন্দর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।