Dhaka 4:12 pm, Thursday, 11 June 2026

একমুঠো সহায়তার অপেক্ষায় হাফিজ উদ্দিনের জীবনযুদ্ধ: ১০৪ বছরেও বেঁচে থাকার সংগ্রাম

নিজস্ব প্রতিবেদক জীবন দেওয়ান উজ্জ্বল

কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর পৌরসভার বাকরেরহাট এলাকায় শতবর্ষ পেরিয়ে ১০৪ বছর বয়সেও জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন হাফিজ উদ্দিন। একসময়ের স্বচ্ছল কৃষক ও এলাকার পরিচিত ব্যক্তিত্ব আজ চরম দারিদ্র্য, অসুস্থতা ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আবাদি জমির মাঝখানে জরাজীর্ণ একটি টিনের ঘরই এখন তার শেষ আশ্রয়স্থল।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯২২ সালের ১১ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন হাফিজ উদ্দিন। একসময় জমিজমা, পরিবার ও স্বপ্নে ভরা সুখী জীবন ছিল তার। স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে সুন্দর সংসার গড়ে তুলেছিলেন তিনি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় নানা প্রতিকূলতায় সেই সুখের সংসার ভেঙে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, পুত্রসন্তান না থাকার সুযোগে আত্মীয়-স্বজন কৌশলে তার সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখিয়ে নেন। ফলে একসময়ের স্বচ্ছল এই মানুষটি ধীরে ধীরে নিঃস্ব হয়ে পড়েন।

জীবনের কঠিন বাস্তবতায় একপর্যায়ে সংসার চালাতে ভিক্ষাবৃত্তিকেও বেছে নিতে হয় তাকে। তবুও কষ্ট করে মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করেন। তবে প্রায় ১৪ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পর তার দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলার পর জীবনযুদ্ধ হয়ে ওঠে আরও কঠিন। পরে স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে যান। তখন থেকেই একাকিত্ব তার নিত্যসঙ্গী।

বর্তমানে হাফিজ উদ্দিনের বসবাসের ঘরটিতে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ, নেই শৌচাগারের ব্যবস্থা। এমনকি সেখানে পৌঁছানোর জন্যও নেই উপযুক্ত কোনো রাস্তা। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই বৃদ্ধের জীবন এখন অনেকটাই নির্ভরশীল প্রতিবেশীদের সহানুভূতির ওপর। কেউ খাবার দিলে খেতে পারেন, না দিলে উপোস করেই কাটাতে হয় দিন।

তিনি বয়স্ক ভাতা ও ভিজিএফের চাল পেলেও তা নিয়মিত নয় বলে জানান। ফলে খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করাও তার জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, “চাচা খুব কষ্টে আছেন। কেউ খাবার দিলে খান, না দিলে না খেয়েই থাকেন। আমরা যতটুকু পারি সহযোগিতা করি, কিন্তু তার জন্য আরও বড় ধরনের সহায়তা দরকার। ঘরে টয়লেট নেই, বিদ্যুৎ নেই। অন্ধকারে থাকতে হয়, চারপাশে পোকামাকড়ের উপদ্রব।”

নিজের অসহায় অবস্থার কথা তুলে ধরে হাফিজ উদ্দিন বলেন, “বয়স অনেক হয়েছে। ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারি না। কেউ খাবার দিলে খাই, না দিলে উপোস থাকি। আল্লাহ যতদিন রাখেন, ততদিন এভাবেই চলছি। কেউ যদি একটা হুইলচেয়ার দিত, অনেক উপকার হতো।”

এ বিষয়ে উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম আরিফ বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শতবর্ষী এই অসহায় বৃদ্ধের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি নিরাপদ বাসস্থান, হুইলচেয়ার, নিয়মিত খাদ্য সহায়তা এবং চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তাদের মতে, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মানবিক দায়িত্ব থেকে এগিয়ে এলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন হাফিজ উদ্দিন।

১০৪ বছর বয়সী হাফিজ উদ্দিন আজও বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তার দিকে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

বাংলাবাজার ইউনিয়নে স্পোকেন ইংলিশ কোর্সে ভর্তি চলছে

একমুঠো সহায়তার অপেক্ষায় হাফিজ উদ্দিনের জীবনযুদ্ধ: ১০৪ বছরেও বেঁচে থাকার সংগ্রাম

Update Time : 11:43:05 pm, Monday, 8 June 2026

নিজস্ব প্রতিবেদক জীবন দেওয়ান উজ্জ্বল

কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর পৌরসভার বাকরেরহাট এলাকায় শতবর্ষ পেরিয়ে ১০৪ বছর বয়সেও জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন হাফিজ উদ্দিন। একসময়ের স্বচ্ছল কৃষক ও এলাকার পরিচিত ব্যক্তিত্ব আজ চরম দারিদ্র্য, অসুস্থতা ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আবাদি জমির মাঝখানে জরাজীর্ণ একটি টিনের ঘরই এখন তার শেষ আশ্রয়স্থল।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯২২ সালের ১১ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন হাফিজ উদ্দিন। একসময় জমিজমা, পরিবার ও স্বপ্নে ভরা সুখী জীবন ছিল তার। স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে সুন্দর সংসার গড়ে তুলেছিলেন তিনি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় নানা প্রতিকূলতায় সেই সুখের সংসার ভেঙে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, পুত্রসন্তান না থাকার সুযোগে আত্মীয়-স্বজন কৌশলে তার সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখিয়ে নেন। ফলে একসময়ের স্বচ্ছল এই মানুষটি ধীরে ধীরে নিঃস্ব হয়ে পড়েন।

জীবনের কঠিন বাস্তবতায় একপর্যায়ে সংসার চালাতে ভিক্ষাবৃত্তিকেও বেছে নিতে হয় তাকে। তবুও কষ্ট করে মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করেন। তবে প্রায় ১৪ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পর তার দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলার পর জীবনযুদ্ধ হয়ে ওঠে আরও কঠিন। পরে স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে যান। তখন থেকেই একাকিত্ব তার নিত্যসঙ্গী।

বর্তমানে হাফিজ উদ্দিনের বসবাসের ঘরটিতে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ, নেই শৌচাগারের ব্যবস্থা। এমনকি সেখানে পৌঁছানোর জন্যও নেই উপযুক্ত কোনো রাস্তা। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই বৃদ্ধের জীবন এখন অনেকটাই নির্ভরশীল প্রতিবেশীদের সহানুভূতির ওপর। কেউ খাবার দিলে খেতে পারেন, না দিলে উপোস করেই কাটাতে হয় দিন।

তিনি বয়স্ক ভাতা ও ভিজিএফের চাল পেলেও তা নিয়মিত নয় বলে জানান। ফলে খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করাও তার জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, “চাচা খুব কষ্টে আছেন। কেউ খাবার দিলে খান, না দিলে না খেয়েই থাকেন। আমরা যতটুকু পারি সহযোগিতা করি, কিন্তু তার জন্য আরও বড় ধরনের সহায়তা দরকার। ঘরে টয়লেট নেই, বিদ্যুৎ নেই। অন্ধকারে থাকতে হয়, চারপাশে পোকামাকড়ের উপদ্রব।”

নিজের অসহায় অবস্থার কথা তুলে ধরে হাফিজ উদ্দিন বলেন, “বয়স অনেক হয়েছে। ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারি না। কেউ খাবার দিলে খাই, না দিলে উপোস থাকি। আল্লাহ যতদিন রাখেন, ততদিন এভাবেই চলছি। কেউ যদি একটা হুইলচেয়ার দিত, অনেক উপকার হতো।”

এ বিষয়ে উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম আরিফ বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শতবর্ষী এই অসহায় বৃদ্ধের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি নিরাপদ বাসস্থান, হুইলচেয়ার, নিয়মিত খাদ্য সহায়তা এবং চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তাদের মতে, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মানবিক দায়িত্ব থেকে এগিয়ে এলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন হাফিজ উদ্দিন।

১০৪ বছর বয়সী হাফিজ উদ্দিন আজও বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তার দিকে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী।