Dhaka 10:12 am, Tuesday, 16 June 2026

ডিজিটাল হাজিরা দিতে গাছে উঠলেন শিক্ষক!‘স্মার্ট বাংলাদেশে’বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্নঃ জনমনে

নিজস্ব প্রতিবেদক:

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সারাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু হয়েছে অনলাইন হাজিরা ব্যবস্থা। নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন সকাল ৯টার মধ্যে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে হাজিরা খাতার ছবি তুলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে হবে। তবে সমতলের জন্য সহজ এই নিয়ম রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে শিক্ষকদের জন্য হয়ে উঠেছে চরম ভোগান্তির কারণ।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ছবি এ বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। ছবিতে দেখা যায়, রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার এক শিক্ষক মোবাইল নেটওয়ার্কের সন্ধানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটি উঁচু আমগাছের ডালে বসে আছেন।

জানা যায়, বাঘাইছড়ি উপজেলার পাকুজ্জোছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবু তাহের বিদ্যালয়ে এসে নিয়ম অনুযায়ী হাজিরা খাতার ছবি পাঠানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বিদ্যালয় এলাকায় কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় তিনি প্রথমে বিদ্যালয়ের ছাদে এবং পরে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে একটি বড় আমগাছের মগডালে উঠে নেটওয়ার্ক খুঁজে পান এবং সেখান থেকে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে হাজিরার ছবি পাঠাতে সক্ষম হন।

এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আবু তাহের বলেন, “চাকরি বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে গাছে উঠতে হয়েছে। হাজিরা পাঠাতে না পারলে চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতো, যা আমার পরিবারের জন্য কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করত।”

রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট ৭০৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম দিনেই ১৭০টি বিদ্যালয় থেকে কোনো অনলাইন হাজিরার তথ্য পাওয়া যায়নি। এর প্রধান কারণ সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে মোবাইল নেটওয়ার্কের অনুপস্থিতি। শুধু বাঘাইছড়ি উপজেলাতেই ২৮টি বিদ্যালয়ের ৮৩ জন শিক্ষক প্রথম দিনে হাজিরা পাঠাতে পারেননি।

শিক্ষকরা বলছেন, সমতলের অনেক এলাকায় যেখানে সহজেই ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধা পাওয়া যায়, সেখানে পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখনও বহু বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ ও নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছেনি। ফলে একই নিয়ম দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে কার্যকর করা বাস্তবসম্মত নয়।

এ পরিস্থিতিতে রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি নজির আহমদ তালুকদার পাহাড়ি এলাকার বিশেষ ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অনলাইন হাজিরা ব্যবস্থায় নমনীয়তা আনার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কফিল উদ্দিন জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় নেটওয়ার্ক সংকট রয়েছে সেসব বিদ্যালয়ের তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে এবং পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা তখনই সফল হয় যখন তা দেশের সব অঞ্চলের মানুষের জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য হয়। কিন্তু একজন শিক্ষককে শুধুমাত্র হাজিরা নিশ্চিত করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাছে উঠতে হওয়া ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

উন্নয়নের সুফল কি দেশের প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের কাছেও সমানভাবে পৌঁছেছে? নাকি অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর না করেই ডিজিটাল ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে?—এই প্রশ্নের উত্তর এখন সময়ের দাবি।

#রাঙামাটি #বাঘাইছড়ি #ডিজিটাল_হাজিরা #স্মার্টবাংলাদেশ #প্রাথমিকশিক্ষা #শিক্ষক #নেটওয়ার্কসংকট #পাহাড়ি_জনপদ #বাংলাদেশ_শিক্ষা #

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

Reiসালথায় ইউপি চেয়ারম্যান ও যুবলীগের সাবেক সভাপতি গ্রেপ্তার

ডিজিটাল হাজিরা দিতে গাছে উঠলেন শিক্ষক!‘স্মার্ট বাংলাদেশে’বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্নঃ জনমনে

Update Time : 10:30:35 pm, Monday, 15 June 2026

নিজস্ব প্রতিবেদক:

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সারাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু হয়েছে অনলাইন হাজিরা ব্যবস্থা। নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন সকাল ৯টার মধ্যে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে হাজিরা খাতার ছবি তুলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে হবে। তবে সমতলের জন্য সহজ এই নিয়ম রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে শিক্ষকদের জন্য হয়ে উঠেছে চরম ভোগান্তির কারণ।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ছবি এ বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। ছবিতে দেখা যায়, রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার এক শিক্ষক মোবাইল নেটওয়ার্কের সন্ধানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটি উঁচু আমগাছের ডালে বসে আছেন।

জানা যায়, বাঘাইছড়ি উপজেলার পাকুজ্জোছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবু তাহের বিদ্যালয়ে এসে নিয়ম অনুযায়ী হাজিরা খাতার ছবি পাঠানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বিদ্যালয় এলাকায় কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় তিনি প্রথমে বিদ্যালয়ের ছাদে এবং পরে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে একটি বড় আমগাছের মগডালে উঠে নেটওয়ার্ক খুঁজে পান এবং সেখান থেকে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে হাজিরার ছবি পাঠাতে সক্ষম হন।

এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আবু তাহের বলেন, “চাকরি বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে গাছে উঠতে হয়েছে। হাজিরা পাঠাতে না পারলে চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতো, যা আমার পরিবারের জন্য কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করত।”

রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট ৭০৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম দিনেই ১৭০টি বিদ্যালয় থেকে কোনো অনলাইন হাজিরার তথ্য পাওয়া যায়নি। এর প্রধান কারণ সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে মোবাইল নেটওয়ার্কের অনুপস্থিতি। শুধু বাঘাইছড়ি উপজেলাতেই ২৮টি বিদ্যালয়ের ৮৩ জন শিক্ষক প্রথম দিনে হাজিরা পাঠাতে পারেননি।

শিক্ষকরা বলছেন, সমতলের অনেক এলাকায় যেখানে সহজেই ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধা পাওয়া যায়, সেখানে পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখনও বহু বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ ও নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছেনি। ফলে একই নিয়ম দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে কার্যকর করা বাস্তবসম্মত নয়।

এ পরিস্থিতিতে রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি নজির আহমদ তালুকদার পাহাড়ি এলাকার বিশেষ ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অনলাইন হাজিরা ব্যবস্থায় নমনীয়তা আনার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কফিল উদ্দিন জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় নেটওয়ার্ক সংকট রয়েছে সেসব বিদ্যালয়ের তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে এবং পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা তখনই সফল হয় যখন তা দেশের সব অঞ্চলের মানুষের জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য হয়। কিন্তু একজন শিক্ষককে শুধুমাত্র হাজিরা নিশ্চিত করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাছে উঠতে হওয়া ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

উন্নয়নের সুফল কি দেশের প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের কাছেও সমানভাবে পৌঁছেছে? নাকি অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর না করেই ডিজিটাল ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে?—এই প্রশ্নের উত্তর এখন সময়ের দাবি।

#রাঙামাটি #বাঘাইছড়ি #ডিজিটাল_হাজিরা #স্মার্টবাংলাদেশ #প্রাথমিকশিক্ষা #শিক্ষক #নেটওয়ার্কসংকট #পাহাড়ি_জনপদ #বাংলাদেশ_শিক্ষা #