Dhaka 1:53 pm, Friday, 26 June 2026

নরসিংদীর শিবপুরে প্রায় দেড় লাখ টাকা অতিরিক্ত উত্তোলনের অভিযোগ; চেয়ারম্যানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ, তদন্তে প্রশাসন

আবু নাঈম রিপন:- নরসিংদী প্রতিনিধি

 

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়ন পরিষদে চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ১৮ মাস পরও চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে এক গ্রাম পুলিশের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

অভিযোগ অনুযায়ী, দুলালপুর ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ নুরুল ইসলাম-এর জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী জন্মতারিখ ২০ ডিসেম্বর ১৯৬৫। সরকারি বিধি অনুযায়ী তার চাকরির মেয়াদ শেষ হয় ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪। কিন্তু অবসরের পরও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন এবং চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নের ভিত্তিতে নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করে আসছিলেন।

জানা গেছে, প্রতি তিন থেকে ছয় মাস পরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে গ্রাম পুলিশদের সরকারি বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়। সম্প্রতি জুন মাসের বেতন-ভাতার প্রত্যয়ন দেওয়ার আগে দুলালপুর ইউনিয়ন পরিষদের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক মো. আলতাফ হোসেন সকল গ্রাম পুলিশের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দিতে বলেন।

যাচাই-বাছাইয়ে দেখা যায়, নুরুল ইসলামের চাকরির মেয়াদ প্রায় ১৮ মাস আগেই শেষ হয়েছে। এরপরও তিনি সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন। প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, এই সময়ে তিনি অতিরিক্ত ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫১৬ টাকা সরকারি কোষাগার থেকে উত্তোলন করেছেন।

স্থানীয়ভাবে এ ঘটনায় নানা আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের ধারণা, চেয়ারম্যানের প্রত্যয়ন ছাড়া এভাবে দীর্ঘদিন সরকারি অর্থ উত্তোলন সম্ভব নয়। ফলে চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট গ্রাম পুলিশের মধ্যে যোগসাজশে অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি উঠেছে। যদিও এ অভিযোগের কোনো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

অভিযুক্ত গ্রাম পুলিশ নুরুল ইসলাম বলেন, চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি তিনি চেয়ারম্যান মো. মাহফুজুল হক শামীম মোল্লাকে জানিয়েছিলেন। চেয়ারম্যান তাকে দায়িত্ব পালন চালিয়ে যেতে বলেন এবং আশ্বস্ত করেন যে কোনো সমস্যা হলে তিনি দেখবেন। সেই বিশ্বাসে তিনি উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেছেন এবং চেয়ারম্যানের সন্তোষজনক প্রত্যয়নের ভিত্তিতে সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন।

তবে চেয়ারম্যান মাহফুজুল হক শামীম মোল্লা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, গ্রাম পুলিশ নুরুল ইসলামের চাকরির মেয়াদ কখন শেষ হয়েছে তা তার জানা ছিল না। তিনি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছিলেন বলেই প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে। অর্থ ভাগাভাগির অভিযোগও তিনি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, নুরুল ইসলাম কখনো তাকে চাকরি শেষ হওয়ার বিষয়টি জানাননি।

দুলালপুর ইউনিয়ন পরিষদের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক মো. আলতাফ হোসেন বলেন, অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণের পর গ্রাম পুলিশদের কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে বিষয়টি তার নজরে আসে। এরপর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করেন।

এ বিষয়ে শিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. ফারজানা ইয়াসমিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সরকারি অর্থ ফেরত চেয়ে এবং এ অনিয়মের ব্যাখ্যা জানতে চেয়ারম্যানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশের জবাব পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ঘটনাটি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশাসনের তদন্তে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

টেকনাফে ডাকাত দলের নৃশংস হামলা: ৮টি ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত মুদি ব্যবসায়ী, লুট প্রায় ২ লাখ টাকার মালামাল

নরসিংদীর শিবপুরে প্রায় দেড় লাখ টাকা অতিরিক্ত উত্তোলনের অভিযোগ; চেয়ারম্যানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ, তদন্তে প্রশাসন

Update Time : 10:34:12 pm, Thursday, 25 June 2026

আবু নাঈম রিপন:- নরসিংদী প্রতিনিধি

 

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়ন পরিষদে চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ১৮ মাস পরও চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে এক গ্রাম পুলিশের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

অভিযোগ অনুযায়ী, দুলালপুর ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ নুরুল ইসলাম-এর জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী জন্মতারিখ ২০ ডিসেম্বর ১৯৬৫। সরকারি বিধি অনুযায়ী তার চাকরির মেয়াদ শেষ হয় ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪। কিন্তু অবসরের পরও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন এবং চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নের ভিত্তিতে নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করে আসছিলেন।

জানা গেছে, প্রতি তিন থেকে ছয় মাস পরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে গ্রাম পুলিশদের সরকারি বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়। সম্প্রতি জুন মাসের বেতন-ভাতার প্রত্যয়ন দেওয়ার আগে দুলালপুর ইউনিয়ন পরিষদের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক মো. আলতাফ হোসেন সকল গ্রাম পুলিশের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দিতে বলেন।

যাচাই-বাছাইয়ে দেখা যায়, নুরুল ইসলামের চাকরির মেয়াদ প্রায় ১৮ মাস আগেই শেষ হয়েছে। এরপরও তিনি সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন। প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, এই সময়ে তিনি অতিরিক্ত ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫১৬ টাকা সরকারি কোষাগার থেকে উত্তোলন করেছেন।

স্থানীয়ভাবে এ ঘটনায় নানা আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের ধারণা, চেয়ারম্যানের প্রত্যয়ন ছাড়া এভাবে দীর্ঘদিন সরকারি অর্থ উত্তোলন সম্ভব নয়। ফলে চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট গ্রাম পুলিশের মধ্যে যোগসাজশে অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি উঠেছে। যদিও এ অভিযোগের কোনো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

অভিযুক্ত গ্রাম পুলিশ নুরুল ইসলাম বলেন, চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি তিনি চেয়ারম্যান মো. মাহফুজুল হক শামীম মোল্লাকে জানিয়েছিলেন। চেয়ারম্যান তাকে দায়িত্ব পালন চালিয়ে যেতে বলেন এবং আশ্বস্ত করেন যে কোনো সমস্যা হলে তিনি দেখবেন। সেই বিশ্বাসে তিনি উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেছেন এবং চেয়ারম্যানের সন্তোষজনক প্রত্যয়নের ভিত্তিতে সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন।

তবে চেয়ারম্যান মাহফুজুল হক শামীম মোল্লা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, গ্রাম পুলিশ নুরুল ইসলামের চাকরির মেয়াদ কখন শেষ হয়েছে তা তার জানা ছিল না। তিনি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছিলেন বলেই প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে। অর্থ ভাগাভাগির অভিযোগও তিনি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, নুরুল ইসলাম কখনো তাকে চাকরি শেষ হওয়ার বিষয়টি জানাননি।

দুলালপুর ইউনিয়ন পরিষদের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক মো. আলতাফ হোসেন বলেন, অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণের পর গ্রাম পুলিশদের কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে বিষয়টি তার নজরে আসে। এরপর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করেন।

এ বিষয়ে শিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. ফারজানা ইয়াসমিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সরকারি অর্থ ফেরত চেয়ে এবং এ অনিয়মের ব্যাখ্যা জানতে চেয়ারম্যানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশের জবাব পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ঘটনাটি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশাসনের তদন্তে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।