Dhaka 8:12 am, Monday, 29 June 2026

পরীক্ষা চলাকালীন ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে হোন্ডার ‘ম্যাংগো ফেস্ট’,উচ্চস্বরে মাইকে ভোগান্তিতে পরীক্ষার্থীরা

নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ মাঠে দিনব্যাপী অনুষ্ঠান; পরীক্ষা চলাকালে ডিজে সাউন্ডে ক্ষোভ শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের, অনুমতি নিয়ে ভিন্নমত সংশ্লিষ্টদের

নিজস্ব প্রতিবেদক দৈনিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পাবলিক পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে ১৪৪ ধারা জারি থাকা সত্ত্বেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ মাঠে হোন্ডা মোটরসাইকেলের উদ্যোগে ‘ম্যাংগো ফেস্ট’ আয়োজন এবং উচ্চস্বরে সাউন্ড সিস্টেমে গান বাজানোর অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষার সময় এমন আয়োজনের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়তে হয়েছে চরম ভোগান্তিতে বলে অভিযোগ করেছেন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

শনিবার (২৭ জুন) দিনব্যাপী নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয় ‘হোন্ডা ম্যাংগো ফেস্ট’। একই সময়ে কলেজের মনিমুল হক ভবনের ৫১০১ ও ৫১০২ নম্বর কক্ষে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বেসিক ৩৬০ ঘণ্টা কোর্সের সমাপনী পরীক্ষা-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়। অফিস অ্যাপ্লিকেশন ও ডাটাবেজ প্রোগ্রামিং বিষয়ে এ পরীক্ষায় প্রায় ১২০ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, কলেজের মূল ফটকে টাঙানো নোটিশে স্পষ্টভাবে ১৪৪ ধারা জারির বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। অথচ ওই নোটিশের ঠিক পাশেই দিনব্যাপী উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সাউন্ড বক্সে গান ও ডিজে মিউজিক বাজানো হয়। সকাল ১০টা থেকে লিখিত পরীক্ষা শুরু হয়ে বেলা ১১টায় শেষ হয়। পরে সাড়ে ১১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত প্রথম গ্রুপের মৌখিক পরীক্ষা এবং দেড়টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত দ্বিতীয় গ্রুপের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু পুরো সময়জুড়েই উচ্চস্বরে গান ও সাউন্ড সিস্টেম চলতে থাকে।

পরীক্ষার্থী সোহেল রানা, আব্দুর রহমানসহ একাধিক শিক্ষার্থী জানান, লিখিত পরীক্ষা শুরুর পর থেকেই কলেজ মাঠে উচ্চস্বরে গান বাজানো হচ্ছিল। পরীক্ষার কক্ষ পর্যন্ত সেই শব্দ পৌঁছায়, ফলে মনোযোগ ধরে রেখে পরীক্ষা দিতে তাদের ব্যাপক অসুবিধা হয়েছে। তারা বলেন, পাবলিক পরীক্ষা চলাকালে এ ধরনের উচ্চস্বরে শব্দ সৃষ্টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

অভিভাবক রফিকুল ইসলাম বলেন, “পাবলিক পরীক্ষা চলাকালে কলেজ মাঠে এমন উচ্চস্বরে গান বাজানো অত্যন্ত দায়িত্বহীনতার পরিচয়। এতে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হয়েছে। আরও বিস্ময়ের বিষয়, অনুষ্ঠানস্থলে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেলেও শব্দ নিয়ন্ত্রণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”

হোন্ডার আয়োজিত ম্যাংগো ফেস্টে দিনব্যাপী মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিকেলে কেক কেটে উৎসবের উদ্বোধনে হোন্ডার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার অংশগ্রহণেরও কথা ছিল।

এ বিষয়ে হোন্ডার চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি শিশির মুঠোফোনে বলেন, “কলেজ কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের অনুমতি নিয়েই আমরা অনুষ্ঠান করেছি। ওই দিন কলেজে পরীক্ষা ছিল—এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না।”

তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকরামুল হোসাইন বলেন, “ম্যাংগো ফেস্টের জন্য থানা থেকে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। এমন আয়োজনের বিষয়েও আমাদের জানা ছিল না।”

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, “আমাদের পক্ষ থেকেও কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরীক্ষা চলাকালে কলেজ কর্তৃপক্ষ কেন এমন অনুষ্ঠানের অনুমতি দিল, সেটি তারাই ভালো বলতে পারবেন।”

অন্যদিকে নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ জানান, প্রায় এক মাস আগে কলেজ মাঠ ব্যবহারের জন্য হোন্ডা কর্তৃপক্ষ অনুমতি নিয়েছিল। পরে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড হঠাৎ করে পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ করে। তিনি দাবি করেন, পরীক্ষা কলেজ মাঠ থেকে কিছুটা দূরের ভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে পরীক্ষা চলাকালে মাঠে উচ্চস্বরে অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়ে তিনিও অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

এ ঘটনায় পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরব ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা, ১৪৪ ধারা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

পরীক্ষা চলাকালীন ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে হোন্ডার ‘ম্যাংগো ফেস্ট’,উচ্চস্বরে মাইকে ভোগান্তিতে পরীক্ষার্থীরা

Update Time : 11:06:51 pm, Friday, 26 June 2026

নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ মাঠে দিনব্যাপী অনুষ্ঠান; পরীক্ষা চলাকালে ডিজে সাউন্ডে ক্ষোভ শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের, অনুমতি নিয়ে ভিন্নমত সংশ্লিষ্টদের

নিজস্ব প্রতিবেদক দৈনিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পাবলিক পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে ১৪৪ ধারা জারি থাকা সত্ত্বেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ মাঠে হোন্ডা মোটরসাইকেলের উদ্যোগে ‘ম্যাংগো ফেস্ট’ আয়োজন এবং উচ্চস্বরে সাউন্ড সিস্টেমে গান বাজানোর অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষার সময় এমন আয়োজনের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়তে হয়েছে চরম ভোগান্তিতে বলে অভিযোগ করেছেন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

শনিবার (২৭ জুন) দিনব্যাপী নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয় ‘হোন্ডা ম্যাংগো ফেস্ট’। একই সময়ে কলেজের মনিমুল হক ভবনের ৫১০১ ও ৫১০২ নম্বর কক্ষে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বেসিক ৩৬০ ঘণ্টা কোর্সের সমাপনী পরীক্ষা-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়। অফিস অ্যাপ্লিকেশন ও ডাটাবেজ প্রোগ্রামিং বিষয়ে এ পরীক্ষায় প্রায় ১২০ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, কলেজের মূল ফটকে টাঙানো নোটিশে স্পষ্টভাবে ১৪৪ ধারা জারির বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। অথচ ওই নোটিশের ঠিক পাশেই দিনব্যাপী উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সাউন্ড বক্সে গান ও ডিজে মিউজিক বাজানো হয়। সকাল ১০টা থেকে লিখিত পরীক্ষা শুরু হয়ে বেলা ১১টায় শেষ হয়। পরে সাড়ে ১১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত প্রথম গ্রুপের মৌখিক পরীক্ষা এবং দেড়টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত দ্বিতীয় গ্রুপের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু পুরো সময়জুড়েই উচ্চস্বরে গান ও সাউন্ড সিস্টেম চলতে থাকে।

পরীক্ষার্থী সোহেল রানা, আব্দুর রহমানসহ একাধিক শিক্ষার্থী জানান, লিখিত পরীক্ষা শুরুর পর থেকেই কলেজ মাঠে উচ্চস্বরে গান বাজানো হচ্ছিল। পরীক্ষার কক্ষ পর্যন্ত সেই শব্দ পৌঁছায়, ফলে মনোযোগ ধরে রেখে পরীক্ষা দিতে তাদের ব্যাপক অসুবিধা হয়েছে। তারা বলেন, পাবলিক পরীক্ষা চলাকালে এ ধরনের উচ্চস্বরে শব্দ সৃষ্টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

অভিভাবক রফিকুল ইসলাম বলেন, “পাবলিক পরীক্ষা চলাকালে কলেজ মাঠে এমন উচ্চস্বরে গান বাজানো অত্যন্ত দায়িত্বহীনতার পরিচয়। এতে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হয়েছে। আরও বিস্ময়ের বিষয়, অনুষ্ঠানস্থলে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেলেও শব্দ নিয়ন্ত্রণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”

হোন্ডার আয়োজিত ম্যাংগো ফেস্টে দিনব্যাপী মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিকেলে কেক কেটে উৎসবের উদ্বোধনে হোন্ডার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার অংশগ্রহণেরও কথা ছিল।

এ বিষয়ে হোন্ডার চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি শিশির মুঠোফোনে বলেন, “কলেজ কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের অনুমতি নিয়েই আমরা অনুষ্ঠান করেছি। ওই দিন কলেজে পরীক্ষা ছিল—এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না।”

তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকরামুল হোসাইন বলেন, “ম্যাংগো ফেস্টের জন্য থানা থেকে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। এমন আয়োজনের বিষয়েও আমাদের জানা ছিল না।”

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, “আমাদের পক্ষ থেকেও কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরীক্ষা চলাকালে কলেজ কর্তৃপক্ষ কেন এমন অনুষ্ঠানের অনুমতি দিল, সেটি তারাই ভালো বলতে পারবেন।”

অন্যদিকে নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ জানান, প্রায় এক মাস আগে কলেজ মাঠ ব্যবহারের জন্য হোন্ডা কর্তৃপক্ষ অনুমতি নিয়েছিল। পরে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড হঠাৎ করে পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ করে। তিনি দাবি করেন, পরীক্ষা কলেজ মাঠ থেকে কিছুটা দূরের ভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে পরীক্ষা চলাকালে মাঠে উচ্চস্বরে অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়ে তিনিও অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

এ ঘটনায় পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরব ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা, ১৪৪ ধারা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন।