Dhaka 4:09 pm, Thursday, 25 June 2026

“মহানন্দা নদীতে খননযজ্ঞ, ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ”

নিজস্ব প্রতিবেদক মিসেস চামেলী আক্তার:-

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার গোবরাতলা ইউনিয়নে মহানন্দা নদীর তলদেশ ও নদী রক্ষা বাঁধ সংলগ্ন এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু-মাটি উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম টিপুর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি প্রকল্পের রাস্তা নির্মাণে ব্যবহারের নামে নদী থেকে বালু-মাটি কেটে এনে ভরাট করা হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, রক্ষা বাঁধ, ফসলি জমি ও নদীপাড়ের বসতবাড়ি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার গোবরাতলা ইউনিয়নের দিয়াড় ধাইনগর মহানন্দা নদী ঘাট এলাকা থেকে কয়েকদিন ধরে প্রকাশ্যে বালু-মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। নদী থেকে উত্তোলিত এসব বালু-মাটি সরকারি একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, দিয়াড় ধাইনগর বালুগ্রামের শেষ প্রান্তে সিরাজুলের বাড়ি থেকে ইউসুফের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ২০০ মিটার নতুন সড়ক নির্মাণ করছে সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাবিখা প্রকল্পের আওতায় এ সড়ক নির্মাণে ৬ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের ভরাটের জন্য বাইরে থেকে মাটি বা বালু না কিনে নদী থেকেই অবৈধভাবে উত্তোলন করা হচ্ছে, যাতে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করা যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষক জানান, প্রতি বছরই মহানন্দা নদী থেকে বালু-মাটি উত্তোলন করা হয়। গত বছর নদীর উত্তরাংশে মাটি কাটা হলেও চলতি বছর নদী রক্ষা বাঁধের কাছাকাছি দক্ষিণ অংশে বালু-মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীর তীরে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে এবং বর্ষা মৌসুমে ভাঙনের ঝুঁকি বেড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম বলেন, “সরকার রাস্তার জন্য বরাদ্দ দিয়েছে। অথচ সেই বরাদ্দের অর্থ ব্যয় না করে নদী থেকে মাটি কেটে এনে রাস্তা ভরাট করা হচ্ছে। এতে একদিকে সরকারি অর্থের অপব্যবহার হচ্ছে, অন্যদিকে নদী ও আশপাশের কৃষিজমি হুমকির মুখে পড়ছে।”

স্থানীয় কলেজ শিক্ষক সেলিম রেজা বলেন, “নতুন রাস্তা নির্মাণ অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু রাস্তার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করে নদী থেকে বালু-মাটি উত্তোলন করা হলে তা সরকারি সম্পদের ক্ষতিসাধনের শামিল। বিষয়টি প্রশাসনের গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা প্রয়োজন।”

অভিযোগের বিষয়ে গোবরাতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম টিপু মুঠোফোনে বলেন, “সরকারি কাজে এসব বালু-মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া নদীর ওই অংশ আমার বাপ-দাদার পৈত্রিক সম্পত্তি।” তবে প্রকল্পের বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কেন নদী থেকে মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি তিনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. শাহিনুর আলম জানান, কাবিখা প্রকল্পের আওতায় সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে ৬ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “রাস্তার কাজ পরিদর্শন করেছি। তবে ভরাটের মাটি কোথা থেকে আনা হয়েছে তা আমাদের জানা নেই। যদি নদী থেকে মাটি আনা হয়ে থাকে, তাহলে তা আইনবহির্ভূত। ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ না করার জন্য চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, “বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নদী ও বাঁধের কাছাকাছি অপরিকল্পিতভাবে বালু-মাটি উত্তোলন করলে নদীর গতিপ্রবাহ, কৃষিজমি এবং বসতবাড়ি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।”

এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারুফ আফজাল রাজন বলেন, “নদী থেকে বালু-মাটি উত্তোলনের বিষয়টি আমাদের জানা নেই। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে অবৈধ বালু-মাটি উত্তোলন বন্ধ করে নদী ও রক্ষা বাঁধ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। অন্যথায় আসন্ন বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

স্নাতক (পাস) সমাপনী বর্ষ ও ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় সংবর্ধনা ও দোয়া অনুষ্ঠিত

“মহানন্দা নদীতে খননযজ্ঞ, ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ”

Update Time : 10:55:55 pm, Wednesday, 24 June 2026

নিজস্ব প্রতিবেদক মিসেস চামেলী আক্তার:-

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার গোবরাতলা ইউনিয়নে মহানন্দা নদীর তলদেশ ও নদী রক্ষা বাঁধ সংলগ্ন এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু-মাটি উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম টিপুর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি প্রকল্পের রাস্তা নির্মাণে ব্যবহারের নামে নদী থেকে বালু-মাটি কেটে এনে ভরাট করা হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, রক্ষা বাঁধ, ফসলি জমি ও নদীপাড়ের বসতবাড়ি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার গোবরাতলা ইউনিয়নের দিয়াড় ধাইনগর মহানন্দা নদী ঘাট এলাকা থেকে কয়েকদিন ধরে প্রকাশ্যে বালু-মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। নদী থেকে উত্তোলিত এসব বালু-মাটি সরকারি একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, দিয়াড় ধাইনগর বালুগ্রামের শেষ প্রান্তে সিরাজুলের বাড়ি থেকে ইউসুফের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ২০০ মিটার নতুন সড়ক নির্মাণ করছে সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাবিখা প্রকল্পের আওতায় এ সড়ক নির্মাণে ৬ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের ভরাটের জন্য বাইরে থেকে মাটি বা বালু না কিনে নদী থেকেই অবৈধভাবে উত্তোলন করা হচ্ছে, যাতে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করা যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষক জানান, প্রতি বছরই মহানন্দা নদী থেকে বালু-মাটি উত্তোলন করা হয়। গত বছর নদীর উত্তরাংশে মাটি কাটা হলেও চলতি বছর নদী রক্ষা বাঁধের কাছাকাছি দক্ষিণ অংশে বালু-মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীর তীরে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে এবং বর্ষা মৌসুমে ভাঙনের ঝুঁকি বেড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম বলেন, “সরকার রাস্তার জন্য বরাদ্দ দিয়েছে। অথচ সেই বরাদ্দের অর্থ ব্যয় না করে নদী থেকে মাটি কেটে এনে রাস্তা ভরাট করা হচ্ছে। এতে একদিকে সরকারি অর্থের অপব্যবহার হচ্ছে, অন্যদিকে নদী ও আশপাশের কৃষিজমি হুমকির মুখে পড়ছে।”

স্থানীয় কলেজ শিক্ষক সেলিম রেজা বলেন, “নতুন রাস্তা নির্মাণ অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু রাস্তার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করে নদী থেকে বালু-মাটি উত্তোলন করা হলে তা সরকারি সম্পদের ক্ষতিসাধনের শামিল। বিষয়টি প্রশাসনের গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা প্রয়োজন।”

অভিযোগের বিষয়ে গোবরাতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম টিপু মুঠোফোনে বলেন, “সরকারি কাজে এসব বালু-মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া নদীর ওই অংশ আমার বাপ-দাদার পৈত্রিক সম্পত্তি।” তবে প্রকল্পের বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কেন নদী থেকে মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি তিনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. শাহিনুর আলম জানান, কাবিখা প্রকল্পের আওতায় সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে ৬ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “রাস্তার কাজ পরিদর্শন করেছি। তবে ভরাটের মাটি কোথা থেকে আনা হয়েছে তা আমাদের জানা নেই। যদি নদী থেকে মাটি আনা হয়ে থাকে, তাহলে তা আইনবহির্ভূত। ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ না করার জন্য চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, “বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নদী ও বাঁধের কাছাকাছি অপরিকল্পিতভাবে বালু-মাটি উত্তোলন করলে নদীর গতিপ্রবাহ, কৃষিজমি এবং বসতবাড়ি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।”

এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারুফ আফজাল রাজন বলেন, “নদী থেকে বালু-মাটি উত্তোলনের বিষয়টি আমাদের জানা নেই। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে অবৈধ বালু-মাটি উত্তোলন বন্ধ করে নদী ও রক্ষা বাঁধ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। অন্যথায় আসন্ন বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।