Dhaka 9:37 pm, Saturday, 25 April 2026

লাখাইয়ের হাওরে পাকা ধান ঝুলছে,শ্রমিক নেই,হারভেস্টারও নেই,হতাশায় কৃষক

  • Reporter Name
  • Update Time : 07:45:43 pm, Saturday, 25 April 2026
  • 5 Time View

এম ইয়াকুব হাসান অন্তর,লাখাই প্রতিনিধিঃ

লাখাইয়ের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুমে কৃষক ও মেশিনমালিকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। এক দিকে শ্রমিকসংকট,অন্যদিকে কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার মেশিনে ডিজেল সংকট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি সংগ্রহের জটিল প্রক্রিয়াও সমস্যাকে আরও বাড়িয়েছে। ফলে অনেক এলাকায় ধান কাটা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে হাজারো কৃষকের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, লাখাইয়ের বিভিন্ন হাওরে ধান কাটা শুরু হলেও পর্যাপ্ত হারভেস্টার মেশিন সচল না থাকায় অনেক কৃষক শ্রমিক সংকট ও সময়মতো ফসল কাটার অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। অনেক এলাকায় ধান কাটা থেমে গেছে বা ধীরগতিতে চলছে।
লাখাই উপজেলার পুর্ববুল্লা গ্রামের কৃষক রফিক মিয়া জানান, তিনি প্রায় ৯০ কেয়ার (৩০ একর) জমিতে ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, গত দুই দিনে কষ্ট করে কিছু ধান কাটতে পেরেছি। এখনও অনেক জমি বাকি। ধান পাকলেও কীভাবে কাটব চিন্তায় আছি।
কৃষক শরীফ মিয়া বলেন,জমিতে ধান ভাল ফলন হয়েছে, প্রথম থেকেই সারের সংকট বর্তমানে শ্রমিক সংকট,এক দুইটা হারভেস্টার থাকলেও। ৩০০০/৩২০০ টাকা কেয়ার চাচ্ছে,কি করবো ভেবে পাচ্ছি না,মনে হয় এ বছর ধান ঘরে তুলতে পারবো না,
কৃষক ইসরাইল মিয়া বলেন, সব মিলিয়ে ধান প্রতি মন ১হাজার টাকা মণ খরছ হয়েছে,কিন্তু বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ থেকে ৬৮০ টাকা মান, এত কষ্ট করে ফসল ফলায়ে কি হবে যদি সঠিক মূল্য না পাওয়া যায়।
একই এলাকার কৃষক ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম বললেন, হারভেস্টার মেশিনের মালিক-চালকরা শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) অনেকেই তেল নিতে এসে না পেয়ে ঘুরে গেছেন। দোকানে তেল নাই।
হারভেস্টার মালিক আবদুল হামিদ তিনি বলেন, বুধবার থেকে হাওরে ধান কাটা শুরু করেছি। মেশিনে তেল ছিল। প্রথম দিন কেয়ারে (তিন কেয়ারে এক একর) ২৫০০ টাকা হিসাবে কাজ করেছি, দুই কেয়ার ধান কাটতে পেরেছি। শুক্রবারে চার–পাঁচ কেয়ার কাটা হয়েছে। শনিবার আর মেশিনে তেল না থাকার কারনে চালাতে পারি না।

আবদুল হামিদ আরও বলেন, তেল কিনতে পাম্পে গেলে তারা জানায় কৃষি কর্মকর্তা ও ইউএনওর স্বাক্ষরযুক্ত স্লিপ লাগবে। আরও জানায় ১০০ লিটারের বেশি তেল দেওয়া যাবে না। এভাবে ঘুরে ঘুরে তেল নিলে কীভাবে মেশিন চালাব, আর কীভাবে ধান কাটব।
এদিকে,সিংহগ্রামের বাসিন্দা মনু মিয়া জানান, তিনি দুটি হারভেস্টার মেশিন ভাড়ায় এনে স্থানীয় কৃষকদের ধান কাটার কাজ করেন, যা থেকেই তার জীবিকা নির্বাহ হয় এবং অনেক কৃষকও নির্ভরশীল। কিন্তু চলতি মৌসুমে তীব্র ডিজেল সংকটে তার কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একটি মেশিন পুরোপুরি বন্ধ এবং অন্যটি পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। এতে তিনি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং কৃষকরাও সময়মতো ধান কাটতে না পারায় উদ্বেগে রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, আমি দুটি হারভেস্টার মিশিন, ডিজেলের কারণে একটি বন্ধ, আরেকটি সচল থাকলেও পুরো দিন চালাতে পারছি না। যা পাওয়া যায় তা অপ্রতুল। খোলা বাজারে ডিজেল পাওয়া যায় না, লুকিয়ে বিক্রি হলেও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ১০০ টাকার ডিজেল ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। বাজারের ডিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বলা হয় তেল নেই। ফলে বাধ্য হয়ে অন্য বাজার থেকে বেশি দামে তেল আনতে হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কৃষকের ধান কাটা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
এদিকে উপজেলার কৃষকরাও একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, শ্রমিক ও যন্ত্র দুটোই সংকটে পড়ায় ধান কাটার কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে লাখাই উপজেলায় ১১ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৭০ হেক্টর বেশি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

হ্নীলা একাডেমী বৃত্তিপরীক্ষা ২০২৫-এর বৃত্তিপ্রাপ্তদের সংবর্ধনা ও বৃত্তি প্রদান সম্পন্ন

লাখাইয়ের হাওরে পাকা ধান ঝুলছে,শ্রমিক নেই,হারভেস্টারও নেই,হতাশায় কৃষক

Update Time : 07:45:43 pm, Saturday, 25 April 2026

এম ইয়াকুব হাসান অন্তর,লাখাই প্রতিনিধিঃ

লাখাইয়ের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুমে কৃষক ও মেশিনমালিকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। এক দিকে শ্রমিকসংকট,অন্যদিকে কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার মেশিনে ডিজেল সংকট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি সংগ্রহের জটিল প্রক্রিয়াও সমস্যাকে আরও বাড়িয়েছে। ফলে অনেক এলাকায় ধান কাটা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে হাজারো কৃষকের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, লাখাইয়ের বিভিন্ন হাওরে ধান কাটা শুরু হলেও পর্যাপ্ত হারভেস্টার মেশিন সচল না থাকায় অনেক কৃষক শ্রমিক সংকট ও সময়মতো ফসল কাটার অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। অনেক এলাকায় ধান কাটা থেমে গেছে বা ধীরগতিতে চলছে।
লাখাই উপজেলার পুর্ববুল্লা গ্রামের কৃষক রফিক মিয়া জানান, তিনি প্রায় ৯০ কেয়ার (৩০ একর) জমিতে ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, গত দুই দিনে কষ্ট করে কিছু ধান কাটতে পেরেছি। এখনও অনেক জমি বাকি। ধান পাকলেও কীভাবে কাটব চিন্তায় আছি।
কৃষক শরীফ মিয়া বলেন,জমিতে ধান ভাল ফলন হয়েছে, প্রথম থেকেই সারের সংকট বর্তমানে শ্রমিক সংকট,এক দুইটা হারভেস্টার থাকলেও। ৩০০০/৩২০০ টাকা কেয়ার চাচ্ছে,কি করবো ভেবে পাচ্ছি না,মনে হয় এ বছর ধান ঘরে তুলতে পারবো না,
কৃষক ইসরাইল মিয়া বলেন, সব মিলিয়ে ধান প্রতি মন ১হাজার টাকা মণ খরছ হয়েছে,কিন্তু বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ থেকে ৬৮০ টাকা মান, এত কষ্ট করে ফসল ফলায়ে কি হবে যদি সঠিক মূল্য না পাওয়া যায়।
একই এলাকার কৃষক ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম বললেন, হারভেস্টার মেশিনের মালিক-চালকরা শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) অনেকেই তেল নিতে এসে না পেয়ে ঘুরে গেছেন। দোকানে তেল নাই।
হারভেস্টার মালিক আবদুল হামিদ তিনি বলেন, বুধবার থেকে হাওরে ধান কাটা শুরু করেছি। মেশিনে তেল ছিল। প্রথম দিন কেয়ারে (তিন কেয়ারে এক একর) ২৫০০ টাকা হিসাবে কাজ করেছি, দুই কেয়ার ধান কাটতে পেরেছি। শুক্রবারে চার–পাঁচ কেয়ার কাটা হয়েছে। শনিবার আর মেশিনে তেল না থাকার কারনে চালাতে পারি না।

আবদুল হামিদ আরও বলেন, তেল কিনতে পাম্পে গেলে তারা জানায় কৃষি কর্মকর্তা ও ইউএনওর স্বাক্ষরযুক্ত স্লিপ লাগবে। আরও জানায় ১০০ লিটারের বেশি তেল দেওয়া যাবে না। এভাবে ঘুরে ঘুরে তেল নিলে কীভাবে মেশিন চালাব, আর কীভাবে ধান কাটব।
এদিকে,সিংহগ্রামের বাসিন্দা মনু মিয়া জানান, তিনি দুটি হারভেস্টার মেশিন ভাড়ায় এনে স্থানীয় কৃষকদের ধান কাটার কাজ করেন, যা থেকেই তার জীবিকা নির্বাহ হয় এবং অনেক কৃষকও নির্ভরশীল। কিন্তু চলতি মৌসুমে তীব্র ডিজেল সংকটে তার কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একটি মেশিন পুরোপুরি বন্ধ এবং অন্যটি পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। এতে তিনি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং কৃষকরাও সময়মতো ধান কাটতে না পারায় উদ্বেগে রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, আমি দুটি হারভেস্টার মিশিন, ডিজেলের কারণে একটি বন্ধ, আরেকটি সচল থাকলেও পুরো দিন চালাতে পারছি না। যা পাওয়া যায় তা অপ্রতুল। খোলা বাজারে ডিজেল পাওয়া যায় না, লুকিয়ে বিক্রি হলেও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ১০০ টাকার ডিজেল ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। বাজারের ডিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বলা হয় তেল নেই। ফলে বাধ্য হয়ে অন্য বাজার থেকে বেশি দামে তেল আনতে হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কৃষকের ধান কাটা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
এদিকে উপজেলার কৃষকরাও একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, শ্রমিক ও যন্ত্র দুটোই সংকটে পড়ায় ধান কাটার কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে লাখাই উপজেলায় ১১ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৭০ হেক্টর বেশি।