Dhaka 3:26 am, Saturday, 20 June 2026

শিক্ষার্থী মাত্র ২,মাসে ব্যয় প্রায় ৩ লাখ টাকা:প্রশ্নের মুখে বিদ্যানন্দ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়

নিজস্ব প্রতিবেদক:-মোঃ রেজাউল করিম রেজা

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের তালতলায় অবস্থিত বিদ্যানন্দ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় বর্তমানে চরম শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে। সরকারি নথি অনুযায়ী বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১১০ জন। কর্মরত রয়েছেন আটজন শিক্ষক ও একজন অফিস সহকারী। বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩ লাখ টাকা। অথচ সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র দুইজন।

ঈদুল আজহার ছুটির আগে টানা দুই দিন বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে দেখা যায়, সরকারি স্বীকৃত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষই ফাঁকা। শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির কারণে শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নেন না। অনেক শিক্ষক দেরিতে আসেন এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই চলে যান। পাঠদানের পরিবর্তে অনেক সময় আড্ডা ও গল্পগুজবে সময় কাটানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরিদর্শনের দুই দিনের মধ্যে মাত্র একদিন প্রধান শিক্ষক লোকনাথ বর্মণকে বিদ্যালয়ে পাওয়া গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক লোকনাথ বর্মণ বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। তিনি জানান, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আশপাশে নুরানি মাদ্রাসার প্রভাব এবং অভিভাবকদের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি ঝোঁকের কারণে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে গেছে।

প্রধান শিক্ষক দাবি করেন, বর্তমানে বিদ্যালয়ে মোট ১০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে এবং নিয়মিত উপস্থিত থাকে ছয়জন। তবে উপবৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি ১২ থেকে ১৩ জনের কথা উল্লেখ করেন, যা বাস্তব উপস্থিতি ও বিদ্যালয়ের দাবিকৃত শিক্ষার্থী সংখ্যার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আটজন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও আরও চারটি শিক্ষক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এছাড়া গত দুই বছর ধরে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিও গঠন করা হয়নি।

শিক্ষার্থীদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নিলুফা আক্তার জানায়, তাদের শ্রেণিতে মাত্র চারজন শিক্ষার্থী রয়েছে। সপ্তম শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী নেই। একই শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী বাঁধন জানায়, শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নেন না। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী নিরব জানায়, তার শ্রেণিতে সে এবং সাব্বির ছাড়া আর কোনো শিক্ষার্থী নেই।

স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রতিষ্ঠানটিতে শুরু থেকেই শিক্ষার্থী সংকট ছিল, তবে বর্তমানে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।” অন্যদিকে পারুল বেগম অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময় পরিদর্শন বা মনিটরিংয়ের সময় বাইরের শিক্ষার্থী এনে উপস্থিতি দেখানো হয়।

স্থানীয় অভিভাবক মোস্তাফিজার রহমান জানান, বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় তিনি তার নাতিকে সেখান থেকে সরিয়ে একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়েছেন।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়টির ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৪০ জন, সপ্তম শ্রেণিতে ৪০ জন এবং অষ্টম শ্রেণিতে ৩০ জন শিক্ষার্থীর নাম নথিভুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ সরকারি হিসাব অনুযায়ী মোট শিক্ষার্থী ১১০ জন। কিন্তু সরেজমিনে দুই দিনে উপস্থিত পাওয়া গেছে মাত্র চারজন শিক্ষার্থী।

সরকারি নথি ও বাস্তব চিত্রের মধ্যে এমন বড় ধরনের অসঙ্গতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তারা বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা অতিরিক্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, “আমি এখনো বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করিনি। খুব শিগগিরই প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয়দের প্রশ্ন, যেখানে বাস্তবে শিক্ষার্থী নেই বললেই চলে, সেখানে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় করে বিদ্যালয়টি পরিচালনার যৌক্তিকতা কতটুকু—সেই উত্তর এখন খুঁজছে এলাকাবাসী।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

দিঘলিয়ায় কাঁঠালের বাম্পার ফলন, অল্প পুঁজিতে অধিক লাভের আশা চাষি ও ব্যবসায়ীদের

শিক্ষার্থী মাত্র ২,মাসে ব্যয় প্রায় ৩ লাখ টাকা:প্রশ্নের মুখে বিদ্যানন্দ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়

Update Time : 10:55:44 pm, Friday, 19 June 2026

নিজস্ব প্রতিবেদক:-মোঃ রেজাউল করিম রেজা

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের তালতলায় অবস্থিত বিদ্যানন্দ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় বর্তমানে চরম শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে। সরকারি নথি অনুযায়ী বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১১০ জন। কর্মরত রয়েছেন আটজন শিক্ষক ও একজন অফিস সহকারী। বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩ লাখ টাকা। অথচ সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র দুইজন।

ঈদুল আজহার ছুটির আগে টানা দুই দিন বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে দেখা যায়, সরকারি স্বীকৃত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষই ফাঁকা। শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির কারণে শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নেন না। অনেক শিক্ষক দেরিতে আসেন এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই চলে যান। পাঠদানের পরিবর্তে অনেক সময় আড্ডা ও গল্পগুজবে সময় কাটানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরিদর্শনের দুই দিনের মধ্যে মাত্র একদিন প্রধান শিক্ষক লোকনাথ বর্মণকে বিদ্যালয়ে পাওয়া গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক লোকনাথ বর্মণ বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। তিনি জানান, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আশপাশে নুরানি মাদ্রাসার প্রভাব এবং অভিভাবকদের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি ঝোঁকের কারণে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে গেছে।

প্রধান শিক্ষক দাবি করেন, বর্তমানে বিদ্যালয়ে মোট ১০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে এবং নিয়মিত উপস্থিত থাকে ছয়জন। তবে উপবৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি ১২ থেকে ১৩ জনের কথা উল্লেখ করেন, যা বাস্তব উপস্থিতি ও বিদ্যালয়ের দাবিকৃত শিক্ষার্থী সংখ্যার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আটজন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও আরও চারটি শিক্ষক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এছাড়া গত দুই বছর ধরে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিও গঠন করা হয়নি।

শিক্ষার্থীদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নিলুফা আক্তার জানায়, তাদের শ্রেণিতে মাত্র চারজন শিক্ষার্থী রয়েছে। সপ্তম শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী নেই। একই শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী বাঁধন জানায়, শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নেন না। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী নিরব জানায়, তার শ্রেণিতে সে এবং সাব্বির ছাড়া আর কোনো শিক্ষার্থী নেই।

স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রতিষ্ঠানটিতে শুরু থেকেই শিক্ষার্থী সংকট ছিল, তবে বর্তমানে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।” অন্যদিকে পারুল বেগম অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময় পরিদর্শন বা মনিটরিংয়ের সময় বাইরের শিক্ষার্থী এনে উপস্থিতি দেখানো হয়।

স্থানীয় অভিভাবক মোস্তাফিজার রহমান জানান, বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় তিনি তার নাতিকে সেখান থেকে সরিয়ে একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়েছেন।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়টির ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৪০ জন, সপ্তম শ্রেণিতে ৪০ জন এবং অষ্টম শ্রেণিতে ৩০ জন শিক্ষার্থীর নাম নথিভুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ সরকারি হিসাব অনুযায়ী মোট শিক্ষার্থী ১১০ জন। কিন্তু সরেজমিনে দুই দিনে উপস্থিত পাওয়া গেছে মাত্র চারজন শিক্ষার্থী।

সরকারি নথি ও বাস্তব চিত্রের মধ্যে এমন বড় ধরনের অসঙ্গতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তারা বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা অতিরিক্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, “আমি এখনো বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করিনি। খুব শিগগিরই প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয়দের প্রশ্ন, যেখানে বাস্তবে শিক্ষার্থী নেই বললেই চলে, সেখানে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় করে বিদ্যালয়টি পরিচালনার যৌক্তিকতা কতটুকু—সেই উত্তর এখন খুঁজছে এলাকাবাসী।