Dhaka 2:09 am, Wednesday, 29 April 2026

কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ ভাঙ্গনে গৃহহীন সাত শতাধিক পরিবার

  • Reporter Name
  • Update Time : 10:32:53 pm, Tuesday, 28 April 2026
  • 3 Time View

মোঃ মশিউর রহমান বিপুল, কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধিঃ

কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ ভাঙ্গন ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত ১৮ দিনে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে প্রায় শতাধিক হেক্টর আবাদি জমি। এই তীব্র ভাঙনের ফলে ভিটেমাটি হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছে সাত শতাধিক পরিবার। ইতোমধ্যে সুখেরবাতি আদর্শগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চর গেন্দার আলগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে।
বর্তমানে আরও কয়েকশ’ পরিবার ভাঙনের মুখে রয়েছে। নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে; দিনরাত অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটছে তাদের জীবন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১০ মাসে চর শৌলমারী ইউনিয়নের সুখেরবাতি, চর গেন্দার আলগা, সোনাপুর, পশ্চিম খেদাইমারী, ঘুঘুমারী ও নামাজের চর এলাকায় অন্তত ৭২০টি পরিবারের বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। এসব পরিবার এখন রাস্তার ধারে কিংবা অন্যের জমিতে অস্থায়ী ঝুপড়ি তুলে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন চললেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বসতভিটা হারিয়ে অনেকেই খোলা আকাশের নিচে বা রাস্তার পাশে আশ্রয় নিয়েছেন। চর ঘুঘুমারীর বাসিন্দা মোছা. রহিমা বেওয়া তিন মেয়েকে নিয়ে একাই সংগ্রাম করছেন। নিজের কোনো জমি না থাকায় কোথায় স্থায়ীভাবে থাকবেন, তা নিয়েই তিনি অনিশ্চয়তায় আছেন।
একই এলাকার ভুক্তভোগী মো. সরবেশ পাগলা জানান, তার স্ত্রী ও মেয়ে দুজনই প্রতিবন্ধী। গত দেড় বছরে তিনবার ভাঙনের শিকার হয়ে বারবার বসতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন, যা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুখেরবাতি চরের বাসিন্দা মো. ফুলচান বলেন, তার বাড়ি চারবার নদীতে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে অন্যের জমিতে অস্থায়ীভাবে থাকলেও সেখান থেকেও উচ্ছেদের আশঙ্কায় রয়েছেন।
চর গেন্দার আলগা এলাকার মোছা. সুন্দরী খাতুন জানান, তার বসতবাড়ি পাঁচবার ভেঙেছে। ছোট সন্তানদের নিয়ে কোথাও স্থায়ী আশ্রয় মিলছে না। স্বামী অসুস্থ থাকায় পরিবারের উপার্জনের পথও বন্ধ।
এদিকে সুখেরবাতি চরের মোছা. আনজুয়ারা জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর প্রতিবন্ধী ছেলে ও তালাকপ্রাপ্ত মেয়েকে নিয়ে তিনি মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। বারবার ভাঙনের শিকার হয়ে তিনি এখন দিশেহারা এবং দ্রুত ভাঙনরোধের দাবি জানিয়েছেন।
একই এলাকার মোছা. হাজেরা বেওয়া জানান, তার শেষ সম্বলটুকুও নদীতে হারিয়েছেন। ঘর তোলার সামর্থ্য না থাকায় তিনি এখন রাস্তার পাশে ঝুপড়ি বেঁধে বসবাস করছেন।
পেশায় ইমাম মো. কুরবান আলী মুন্সী বলেন, ভিটেমাটি হারিয়ে তিনি আত্মীয়ের জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন। স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সবসময় উচ্ছেদের আতঙ্কে থাকেন।
চর শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. সমসের আলী জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ৭২০টি পরিবারের তালিকা ইউপি চেয়ারম্যান এ কে এম সাইদুর রহমান দুলালের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, এ এলাকায় সারা বছরই কমবেশি নদীভাঙন চলতে থাকে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান জানান, ভাঙনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তবে বর্তমানে জরুরি কোনো বরাদ্দ নেই।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

​গড়েয়া স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আব্দুল খালেকের ওপর সন্ত্রাসী হামলা, আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি

কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ ভাঙ্গনে গৃহহীন সাত শতাধিক পরিবার

Update Time : 10:32:53 pm, Tuesday, 28 April 2026

মোঃ মশিউর রহমান বিপুল, কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধিঃ

কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ ভাঙ্গন ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত ১৮ দিনে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে প্রায় শতাধিক হেক্টর আবাদি জমি। এই তীব্র ভাঙনের ফলে ভিটেমাটি হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছে সাত শতাধিক পরিবার। ইতোমধ্যে সুখেরবাতি আদর্শগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চর গেন্দার আলগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে।
বর্তমানে আরও কয়েকশ’ পরিবার ভাঙনের মুখে রয়েছে। নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে; দিনরাত অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটছে তাদের জীবন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১০ মাসে চর শৌলমারী ইউনিয়নের সুখেরবাতি, চর গেন্দার আলগা, সোনাপুর, পশ্চিম খেদাইমারী, ঘুঘুমারী ও নামাজের চর এলাকায় অন্তত ৭২০টি পরিবারের বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। এসব পরিবার এখন রাস্তার ধারে কিংবা অন্যের জমিতে অস্থায়ী ঝুপড়ি তুলে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন চললেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বসতভিটা হারিয়ে অনেকেই খোলা আকাশের নিচে বা রাস্তার পাশে আশ্রয় নিয়েছেন। চর ঘুঘুমারীর বাসিন্দা মোছা. রহিমা বেওয়া তিন মেয়েকে নিয়ে একাই সংগ্রাম করছেন। নিজের কোনো জমি না থাকায় কোথায় স্থায়ীভাবে থাকবেন, তা নিয়েই তিনি অনিশ্চয়তায় আছেন।
একই এলাকার ভুক্তভোগী মো. সরবেশ পাগলা জানান, তার স্ত্রী ও মেয়ে দুজনই প্রতিবন্ধী। গত দেড় বছরে তিনবার ভাঙনের শিকার হয়ে বারবার বসতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন, যা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুখেরবাতি চরের বাসিন্দা মো. ফুলচান বলেন, তার বাড়ি চারবার নদীতে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে অন্যের জমিতে অস্থায়ীভাবে থাকলেও সেখান থেকেও উচ্ছেদের আশঙ্কায় রয়েছেন।
চর গেন্দার আলগা এলাকার মোছা. সুন্দরী খাতুন জানান, তার বসতবাড়ি পাঁচবার ভেঙেছে। ছোট সন্তানদের নিয়ে কোথাও স্থায়ী আশ্রয় মিলছে না। স্বামী অসুস্থ থাকায় পরিবারের উপার্জনের পথও বন্ধ।
এদিকে সুখেরবাতি চরের মোছা. আনজুয়ারা জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর প্রতিবন্ধী ছেলে ও তালাকপ্রাপ্ত মেয়েকে নিয়ে তিনি মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। বারবার ভাঙনের শিকার হয়ে তিনি এখন দিশেহারা এবং দ্রুত ভাঙনরোধের দাবি জানিয়েছেন।
একই এলাকার মোছা. হাজেরা বেওয়া জানান, তার শেষ সম্বলটুকুও নদীতে হারিয়েছেন। ঘর তোলার সামর্থ্য না থাকায় তিনি এখন রাস্তার পাশে ঝুপড়ি বেঁধে বসবাস করছেন।
পেশায় ইমাম মো. কুরবান আলী মুন্সী বলেন, ভিটেমাটি হারিয়ে তিনি আত্মীয়ের জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন। স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সবসময় উচ্ছেদের আতঙ্কে থাকেন।
চর শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. সমসের আলী জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ৭২০টি পরিবারের তালিকা ইউপি চেয়ারম্যান এ কে এম সাইদুর রহমান দুলালের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, এ এলাকায় সারা বছরই কমবেশি নদীভাঙন চলতে থাকে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান জানান, ভাঙনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তবে বর্তমানে জরুরি কোনো বরাদ্দ নেই।