Dhaka 4:05 am, Sunday, 21 June 2026

ইনসাফ মুখে,স্বার্থ অন্তরে:আমরা কি সত্যিই ন্যায়বিচারের পক্ষে-প্রশ্ন জাতির- লেখক মোঃ বাশার

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে আজ সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘ইনসাফ’ ও ‘ন্যায়বিচার’। রাজনৈতিক মঞ্চ, ধর্মীয় আলোচনা, সামাজিক সভা, টেলিভিশনের টকশো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই ন্যায়বিচারের দাবি জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছেই রাখা জরুরি—আমরা কি সত্যিই ন্যায়বিচারের পক্ষে, নাকি কেবল নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ইনসাফের কথা বলি?

বাস্তব চিত্র বলছে, অন্যায়ের শিকার যখন আমরা নিজেরা বা আমাদের কাছের কেউ হই, তখন ন্যায়বিচারের দাবি সবচেয়ে বেশি জোরালো হয়ে ওঠে। কিন্তু একই ধরনের অন্যায় যদি আমাদের রাজনৈতিক দল, আত্মীয়স্বজন, পছন্দের ব্যক্তি কিংবা সমর্থিত কোনো গোষ্ঠীর মাধ্যমে সংঘটিত হয়, তখন আমরা অনেকেই নীরব থাকি। কেউ কেউ আবার সেই অন্যায়কে নানাভাবে যুক্তি দিয়ে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টাও করি। এখানেই প্রকাশ পায় আমাদের নৈতিক সংকট এবং দ্বৈত মানসিকতা।

প্রকৃতপক্ষে ইনসাফ কখনো ব্যক্তি, দল, মত বা গোষ্ঠীভেদে ভিন্ন হতে পারে না। ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি হলো সবার জন্য একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা। অপরাধী যদি নিজের পরিবারের সদস্যও হন, তবুও তাকে অপরাধী হিসেবে স্বীকার করার সাহসই প্রকৃত ন্যায়পরায়ণতার পরিচয়। একইভাবে নির্দোষ ব্যক্তি যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও হন, তার অধিকার রক্ষা করাও ন্যায়বিচারের অপরিহার্য শর্ত।

বর্তমান সময়ে সমাজে বিভাজনের রাজনীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের আগেই আমরা বিবেচনা করি—কথাটি কে বলেছে, সে কোন দলের বা কোন মতাদর্শের অনুসারী। ফলে সত্য অনেক সময় পরিচয়ের আড়ালে চাপা পড়ে যায় এবং ইনসাফ পরাজিত হয় ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের কাছে।

ধর্মীয় মূল্যবোধের দৃষ্টিকোণ থেকেও ইনসাফ মানবজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টধর্মসহ বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলো ন্যায়, সত্য ও সততার শিক্ষা দেয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে দেখা যায়, ধর্মের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিলেও অনেকেই ধর্মের ন্যায়বিচারের শিক্ষাকে যথাযথভাবে অনুসরণ করতে ব্যর্থ হন। ধর্মের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা সহজ, কিন্তু ধর্ম নির্দেশিত ন্যায় ও সত্যের পথে অবিচল থাকা তুলনামূলক কঠিন।

রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও গণমাধ্যম—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইনসাফের প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচার যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, প্রশাসন যদি প্রভাবশালী মহলের কাছে নতি স্বীকার করে এবং গণমাধ্যম যদি সত্য প্রকাশে দ্বৈত নীতি অনুসরণ করে, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নে নয়; বরং জনগণের ন্যায়বিচারের প্রতি বিশ্বাসের মধ্যেও নিহিত থাকে।

পরিবার ও সমাজের ক্ষুদ্র পরিসরেও একই চিত্র পরিলক্ষিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের মধ্যে সমান আচরণ নিশ্চিত করা হয় না, কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় গুরুত্ব পায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধার পরিবর্তে সুপারিশ অগ্রাধিকার পায় এবং সমাজে প্রভাবশালী ও সাধারণ মানুষের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম কার্যকর হতে দেখা যায়। এসব প্রবণতা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই সংকট আরও প্রকট হয়েছে। অনেক সময় তথ্য যাচাই ছাড়াই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা হয়, আবার পছন্দের ব্যক্তিকে একই অভিযোগে নির্দোষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আবেগনির্ভর এই বিচারপ্রবণতা সমাজে ন্যায়বিচারের পরিবেশকে দুর্বল করে তুলছে এবং সত্য অনুসন্ধানের পথকে জটিল করে দিচ্ছে।

ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে ব্যক্তি পর্যায় থেকেই। আমাদের শিখতে হবে—যে অন্যায় নিজের জন্য মেনে নেওয়া যায় না, সেই অন্যায় অন্যের প্রতিও করা যায় না। যে বিচার নিজের জন্য প্রত্যাশা করি, একই বিচার অন্যের জন্যও নিশ্চিত করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। ব্যক্তি, দল বা মতভেদ অনুযায়ী ন্যায়বিচারের মাপকাঠি পরিবর্তিত হলে তা আর ইনসাফ থাকে না; তা পরিণত হয় সুবিধাবাদে।

একটি সভ্য ও মানবিক সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে আইনের শাসন, জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের ওপর। তাই ইনসাফকে শুধু বক্তৃতা, স্লোগান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এটি হতে হবে ব্যক্তি জীবন, পরিবার, কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি, ধর্মীয় অঙ্গন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরের চর্চিত মূল্যবোধ।

শেষ পর্যন্ত সত্য একটাই—ইনসাফের কথা বলা সহজ, কিন্তু ইনসাফের পথে অবিচল থাকা কঠিন। প্রকৃত পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যখন আমরা ব্যক্তিগত স্বার্থ, দলীয় আনুগত্য এবং আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে সত্য এবং অন্যায়কে অন্যায় বলতে শিখব। কারণ ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। মুখে ইনসাফের স্লোগান নয়, বরং বাস্তব জীবনে ইনসাফের চর্চাই একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও উন্নত সমাজ গঠনের একমাত্র পথ।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

রাজশাহীর সর্বোত্র ফেইজবুকে দুই লাইন লিখতে পারা ব্যাক্তিরা ও সাংবাদিক সেজে মহামারীর রুপ ধারণ করে চলেছে

ইনসাফ মুখে,স্বার্থ অন্তরে:আমরা কি সত্যিই ন্যায়বিচারের পক্ষে-প্রশ্ন জাতির- লেখক মোঃ বাশার

Update Time : 11:41:34 pm, Thursday, 18 June 2026

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে আজ সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘ইনসাফ’ ও ‘ন্যায়বিচার’। রাজনৈতিক মঞ্চ, ধর্মীয় আলোচনা, সামাজিক সভা, টেলিভিশনের টকশো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই ন্যায়বিচারের দাবি জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছেই রাখা জরুরি—আমরা কি সত্যিই ন্যায়বিচারের পক্ষে, নাকি কেবল নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ইনসাফের কথা বলি?

বাস্তব চিত্র বলছে, অন্যায়ের শিকার যখন আমরা নিজেরা বা আমাদের কাছের কেউ হই, তখন ন্যায়বিচারের দাবি সবচেয়ে বেশি জোরালো হয়ে ওঠে। কিন্তু একই ধরনের অন্যায় যদি আমাদের রাজনৈতিক দল, আত্মীয়স্বজন, পছন্দের ব্যক্তি কিংবা সমর্থিত কোনো গোষ্ঠীর মাধ্যমে সংঘটিত হয়, তখন আমরা অনেকেই নীরব থাকি। কেউ কেউ আবার সেই অন্যায়কে নানাভাবে যুক্তি দিয়ে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টাও করি। এখানেই প্রকাশ পায় আমাদের নৈতিক সংকট এবং দ্বৈত মানসিকতা।

প্রকৃতপক্ষে ইনসাফ কখনো ব্যক্তি, দল, মত বা গোষ্ঠীভেদে ভিন্ন হতে পারে না। ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি হলো সবার জন্য একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা। অপরাধী যদি নিজের পরিবারের সদস্যও হন, তবুও তাকে অপরাধী হিসেবে স্বীকার করার সাহসই প্রকৃত ন্যায়পরায়ণতার পরিচয়। একইভাবে নির্দোষ ব্যক্তি যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও হন, তার অধিকার রক্ষা করাও ন্যায়বিচারের অপরিহার্য শর্ত।

বর্তমান সময়ে সমাজে বিভাজনের রাজনীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের আগেই আমরা বিবেচনা করি—কথাটি কে বলেছে, সে কোন দলের বা কোন মতাদর্শের অনুসারী। ফলে সত্য অনেক সময় পরিচয়ের আড়ালে চাপা পড়ে যায় এবং ইনসাফ পরাজিত হয় ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের কাছে।

ধর্মীয় মূল্যবোধের দৃষ্টিকোণ থেকেও ইনসাফ মানবজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টধর্মসহ বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলো ন্যায়, সত্য ও সততার শিক্ষা দেয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে দেখা যায়, ধর্মের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিলেও অনেকেই ধর্মের ন্যায়বিচারের শিক্ষাকে যথাযথভাবে অনুসরণ করতে ব্যর্থ হন। ধর্মের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা সহজ, কিন্তু ধর্ম নির্দেশিত ন্যায় ও সত্যের পথে অবিচল থাকা তুলনামূলক কঠিন।

রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও গণমাধ্যম—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইনসাফের প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচার যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, প্রশাসন যদি প্রভাবশালী মহলের কাছে নতি স্বীকার করে এবং গণমাধ্যম যদি সত্য প্রকাশে দ্বৈত নীতি অনুসরণ করে, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নে নয়; বরং জনগণের ন্যায়বিচারের প্রতি বিশ্বাসের মধ্যেও নিহিত থাকে।

পরিবার ও সমাজের ক্ষুদ্র পরিসরেও একই চিত্র পরিলক্ষিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের মধ্যে সমান আচরণ নিশ্চিত করা হয় না, কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় গুরুত্ব পায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধার পরিবর্তে সুপারিশ অগ্রাধিকার পায় এবং সমাজে প্রভাবশালী ও সাধারণ মানুষের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম কার্যকর হতে দেখা যায়। এসব প্রবণতা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই সংকট আরও প্রকট হয়েছে। অনেক সময় তথ্য যাচাই ছাড়াই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা হয়, আবার পছন্দের ব্যক্তিকে একই অভিযোগে নির্দোষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আবেগনির্ভর এই বিচারপ্রবণতা সমাজে ন্যায়বিচারের পরিবেশকে দুর্বল করে তুলছে এবং সত্য অনুসন্ধানের পথকে জটিল করে দিচ্ছে।

ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে ব্যক্তি পর্যায় থেকেই। আমাদের শিখতে হবে—যে অন্যায় নিজের জন্য মেনে নেওয়া যায় না, সেই অন্যায় অন্যের প্রতিও করা যায় না। যে বিচার নিজের জন্য প্রত্যাশা করি, একই বিচার অন্যের জন্যও নিশ্চিত করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। ব্যক্তি, দল বা মতভেদ অনুযায়ী ন্যায়বিচারের মাপকাঠি পরিবর্তিত হলে তা আর ইনসাফ থাকে না; তা পরিণত হয় সুবিধাবাদে।

একটি সভ্য ও মানবিক সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে আইনের শাসন, জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের ওপর। তাই ইনসাফকে শুধু বক্তৃতা, স্লোগান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এটি হতে হবে ব্যক্তি জীবন, পরিবার, কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি, ধর্মীয় অঙ্গন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরের চর্চিত মূল্যবোধ।

শেষ পর্যন্ত সত্য একটাই—ইনসাফের কথা বলা সহজ, কিন্তু ইনসাফের পথে অবিচল থাকা কঠিন। প্রকৃত পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যখন আমরা ব্যক্তিগত স্বার্থ, দলীয় আনুগত্য এবং আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে সত্য এবং অন্যায়কে অন্যায় বলতে শিখব। কারণ ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। মুখে ইনসাফের স্লোগান নয়, বরং বাস্তব জীবনে ইনসাফের চর্চাই একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও উন্নত সমাজ গঠনের একমাত্র পথ।