
এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম: এক লাখ কর্মসংস্থান, ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রত্যাশা। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (Chinese Economic and Industrial Zone) স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নেওয়া এ প্রকল্পকে দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগভিত্তিক শিল্পাঞ্চল উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয়ের মধ্যে চীন সরকার প্রায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দেবে, বাকি অর্থ সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শিল্পাঞ্চলটি চালু হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে বস্ত্র, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস ও রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতে চীনা বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখাতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত সরকারি সমঝোতার ভিত্তিতে আনোয়ারায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর শিল্পাঞ্চলটি গড়ে তোলা হবে। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় এলাকাটি বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত কৌশলগত সুবিধা বহন করছে।
প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয় ২০১৪ সালে, যখন চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বেজার মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৬ সালে ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন ও কারিগরি বিষয়ে বিভিন্ন জটিলতার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন দীর্ঘদিন স্থবির ছিল।
প্রথমদিকে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (সিএইচইসি)-কে ডেভেলপার হিসেবে বিবেচনা করা হলেও চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়ায় অগ্রগতি হয়নি। পরে ২০২২ সালে চীনা সরকারের মনোনয়নের ভিত্তিতে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি)-কে নতুন ডেভেলপার হিসেবে নির্বাচন করা হয়। বেজা জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চূড়ান্ত ডেভেলপার চুক্তির প্রক্রিয়া বর্তমানে শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় আধুনিক শিল্পাঞ্চলের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি সংযোগ সড়ক, ৩৩০ মিটার দীর্ঘ সেতু, ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ চার লেনের সড়ক, ২৫ মিলিয়ন লিটার ধারণক্ষমতার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, সাবস্টেশন, সঞ্চালন লাইন, জলাধার এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানা প্রাচীর।
বেজা সূত্রে জানা গেছে, শিল্পাঞ্চলের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ডেভেলপার চুক্তি স্বাক্ষর ও অর্থায়ন কার্যক্রম চূড়ান্ত হওয়ার পরপরই মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শিল্পাঞ্চলটি বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে।
সম্প্রতি বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেছেন, চীনা পক্ষের সঙ্গে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং উভয় দেশই প্রকল্পটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারভিত্তিতে এগিয়ে নিতে আগ্রহী। তাঁর মতে, এই শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিল্পায়নের গতি আরও বাড়বে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কর্ণফুলী টানেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বে টার্মিনাল এবং আনোয়ারা-কর্ণফুলী শিল্পবেল্টের উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয় করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
Reporter Name 



















