Dhaka 11:47 pm, Monday, 20 April 2026

বন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে চলছে রহম আলীর অবৈধ করাতকল:উজাড় হচ্ছে গজারী বন

ক্রাইম রিপোর্টার,শ্রীপুর(গাজীপুর)
​গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানাধীন রাজাবাড়ী এলাকায় সংরক্ষিত বনের বুক চিরে বীরদর্পণে চলছে অবৈধ করাতকল(স মিল)। অভিযোগ উঠেছে, ঢাকা বন বিভাগের আওতাধীন সূর্যনারায়ণপুর বিট অফিস এবং রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করেই বনের গজারী গাছ নিধনের মহোৎসব চালাচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালী রহম আলী। ২০০৮ সালে বন আইনে মামলা হওয়ার পরেও দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে কীভাবে এই অবৈধ করাতকল সচল থাকে, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
​আদালতের আদেশ বৃদ্ধাঙ্গুলি: ২০০৮-এর আসামী যখন অধিপতি
​প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, রাজাবাড়ী বাজারের ঢাকা-কাপাসিয়া সড়ক সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত এই করাতকলটির মালিক মো: রহম আলী (পিতা: মৃত সায়েদ আলী)। ২০০৮ সালের ৫ মে বন্যপ্রাণী ও বন সংরক্ষণ আইনে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয় (মামলা নং ১৪৭/২০০৮, সিআর নং ১৪৭/০৮)। তৎকালীন ফরেস্টার মো: আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে অভিযানে অবৈধভাবে গজারী গাছ চিরাই করার অপরাধে এই মামলা হয়েছিল।
​আশ্চর্যের বিষয় হলো, ১৮ বছর আগের সেই মামলার আসামী রহম আলী বর্তমানে আরও বেপরোয়া। আইনের তোয়াক্কা না করে রাজাবাড়ী এলাকায় তিনি গড়ে তুলেছেন গজারী গাছ চুরির এক নিরাপদ স্বর্গরাজ্য।
​কর্মকর্তাদের ‘খুঁটির জোর’ ও নীরব ভূমিকা
​স্থানীয়দের দাবি, সূর্যনারায়ণপুর বিট অফিস ও রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাসোহারা দিয়েই এই অবৈধ ব্যবসা চলছে। বর্তমানে ঢাকা বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চোখের সামনেই প্রতিদিন ২-৩ গাড়ি গজারী গাছ অবৈধভাবে কাটা হচ্ছে। বনের গভীর থেকে গাছ কেটে এনে রহম আলীর করাতকলে তা প্রকাশ্য দিবালোকে চিরাই করা হয়।
​নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, “বন বিভাগের লোকবল এলাকায় টহল দিলেও রহম আলীর করাতকলের দিকে তারা ফিরেও তাকায় না। মূলত কর্মকর্তাদের অনৈতিক সহায়তাই রহম আলীর খুঁটির জোর। তারা দেখেও না দেখার ভান করে থাকে।”
​পরিবেশের ওপর ভয়াবহ প্রভাব
​গাজীপুরের ফুসফুস হিসেবে পরিচিত এই গজারী বন এখন অস্তিত্ব সংকটে। প্রতিদিন যেভাবে বনের গাছ উজাড় হচ্ছে, তাতে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে যখন সরকার বন রক্ষায় কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছে, তখন খোদ বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মদদে শ্রীপুরের বন বিলীন হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
​রহস্যময় নীরবতা ও প্রশ্নবিদ্ধ প্রশাসন
​একজন চিহ্নিত বন অপরাধী কীভাবে প্রায় দুই দশক ধরে একই স্থানে অবৈধ করাতকল পরিচালনা করেন, তা নিয়ে বর্তমানে ঢাকা বন বিভাগের পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—আইন কি তবে শুধু সাধারণ মানুষের জন্য? প্রভাবশালী আর অসাধু কর্মকর্তাদের পকেট ভারী হলে কি বনের সম্পদ লুটপাটের লাইসেন্স পাওয়া যায়?
​এলাকাবাসীর দাবি
​রাজাবাড়ী ও শ্রীপুর এলাকার সচেতন নাগরিকরা অবিলম্বে রহম আলীর এই অবৈধ করাতকল উচ্ছেদ এবং বনের গাছ চুরির সাথে জড়িত বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় শ্রীপুরের অবশিষ্ট বনটুকুও মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।
​এই বিষয়ে শ্রীপুর রেঞ্জ ও রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ কর্মকর্তাদের সাথে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা বিষয়টি এড়িয়ে যান অথবা তদন্তের আশ্বাস দিয়ে দায় সারেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ফাউন্ডেশন রাঙ্গামাটি জেলার আয়োজনে শাহাদাত বার্ষিকী আলোচনা মিলাদ অনুষ্ঠিত হয়েছে

বন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে চলছে রহম আলীর অবৈধ করাতকল:উজাড় হচ্ছে গজারী বন

Update Time : 06:26:59 pm, Tuesday, 7 April 2026

ক্রাইম রিপোর্টার,শ্রীপুর(গাজীপুর)
​গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানাধীন রাজাবাড়ী এলাকায় সংরক্ষিত বনের বুক চিরে বীরদর্পণে চলছে অবৈধ করাতকল(স মিল)। অভিযোগ উঠেছে, ঢাকা বন বিভাগের আওতাধীন সূর্যনারায়ণপুর বিট অফিস এবং রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করেই বনের গজারী গাছ নিধনের মহোৎসব চালাচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালী রহম আলী। ২০০৮ সালে বন আইনে মামলা হওয়ার পরেও দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে কীভাবে এই অবৈধ করাতকল সচল থাকে, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
​আদালতের আদেশ বৃদ্ধাঙ্গুলি: ২০০৮-এর আসামী যখন অধিপতি
​প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, রাজাবাড়ী বাজারের ঢাকা-কাপাসিয়া সড়ক সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত এই করাতকলটির মালিক মো: রহম আলী (পিতা: মৃত সায়েদ আলী)। ২০০৮ সালের ৫ মে বন্যপ্রাণী ও বন সংরক্ষণ আইনে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয় (মামলা নং ১৪৭/২০০৮, সিআর নং ১৪৭/০৮)। তৎকালীন ফরেস্টার মো: আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে অভিযানে অবৈধভাবে গজারী গাছ চিরাই করার অপরাধে এই মামলা হয়েছিল।
​আশ্চর্যের বিষয় হলো, ১৮ বছর আগের সেই মামলার আসামী রহম আলী বর্তমানে আরও বেপরোয়া। আইনের তোয়াক্কা না করে রাজাবাড়ী এলাকায় তিনি গড়ে তুলেছেন গজারী গাছ চুরির এক নিরাপদ স্বর্গরাজ্য।
​কর্মকর্তাদের ‘খুঁটির জোর’ ও নীরব ভূমিকা
​স্থানীয়দের দাবি, সূর্যনারায়ণপুর বিট অফিস ও রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাসোহারা দিয়েই এই অবৈধ ব্যবসা চলছে। বর্তমানে ঢাকা বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চোখের সামনেই প্রতিদিন ২-৩ গাড়ি গজারী গাছ অবৈধভাবে কাটা হচ্ছে। বনের গভীর থেকে গাছ কেটে এনে রহম আলীর করাতকলে তা প্রকাশ্য দিবালোকে চিরাই করা হয়।
​নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, “বন বিভাগের লোকবল এলাকায় টহল দিলেও রহম আলীর করাতকলের দিকে তারা ফিরেও তাকায় না। মূলত কর্মকর্তাদের অনৈতিক সহায়তাই রহম আলীর খুঁটির জোর। তারা দেখেও না দেখার ভান করে থাকে।”
​পরিবেশের ওপর ভয়াবহ প্রভাব
​গাজীপুরের ফুসফুস হিসেবে পরিচিত এই গজারী বন এখন অস্তিত্ব সংকটে। প্রতিদিন যেভাবে বনের গাছ উজাড় হচ্ছে, তাতে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে যখন সরকার বন রক্ষায় কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছে, তখন খোদ বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মদদে শ্রীপুরের বন বিলীন হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
​রহস্যময় নীরবতা ও প্রশ্নবিদ্ধ প্রশাসন
​একজন চিহ্নিত বন অপরাধী কীভাবে প্রায় দুই দশক ধরে একই স্থানে অবৈধ করাতকল পরিচালনা করেন, তা নিয়ে বর্তমানে ঢাকা বন বিভাগের পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—আইন কি তবে শুধু সাধারণ মানুষের জন্য? প্রভাবশালী আর অসাধু কর্মকর্তাদের পকেট ভারী হলে কি বনের সম্পদ লুটপাটের লাইসেন্স পাওয়া যায়?
​এলাকাবাসীর দাবি
​রাজাবাড়ী ও শ্রীপুর এলাকার সচেতন নাগরিকরা অবিলম্বে রহম আলীর এই অবৈধ করাতকল উচ্ছেদ এবং বনের গাছ চুরির সাথে জড়িত বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় শ্রীপুরের অবশিষ্ট বনটুকুও মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।
​এই বিষয়ে শ্রীপুর রেঞ্জ ও রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ কর্মকর্তাদের সাথে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা বিষয়টি এড়িয়ে যান অথবা তদন্তের আশ্বাস দিয়ে দায় সারেন।