Dhaka 8:50 pm, Sunday, 26 April 2026

মানবপাচার ও অপহরণ চক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার

  • Reporter Name
  • Update Time : 06:59:11 pm, Sunday, 26 April 2026
  • 1 Time View

স্টাফ রিপোর্টার,রাজশাহী:

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় মানবপাচার ও আন্তঃদেশীয় অপহরণ চক্রের বিরুদ্ধে সফল অভিযান পরিচালনা করেছে বাগমারা থানা পুলিশ। অভিযানে চক্রের সঙ্গে জড়িত ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং লিবিয়ায় আটকে পড়া ২ ভিকটিমকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বাগমারা উপজেলার যোগিপাড়া ইউনিয়নের বীরকুৎসা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক (৪৫) ও একই উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামের জিসান (২২) উন্নত জীবনের আশায় দালাল চক্রের মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার জন্য প্রায় ১০ লাখ টাকার চুক্তি করেন। কিন্তু প্রতারক চক্রটি তাদের ইতালিতে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে কৌশলে লিবিয়ায় পাচার করে।
লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তারা একটি সংঘবদ্ধ বাংলাদেশি মানবপাচারকারী চক্রের কবলে পড়ে। চক্রটি তাদের অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে জোরপূর্বক কঠোর শ্রমে নিয়োজিত করে এবং দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। তাদের পর্যাপ্ত খাদ্য ও বিশ্রাম থেকেও বঞ্চিত করা হয়, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
পরবর্তীতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অপহরণকারীরা ভিকটিমদের পরিবারের সঙ্গে ইমো অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। দাবির সত্যতা প্রমাণে তারা ভিকটিমদের ওপর নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও পাঠায়, যা পরিবারকে আতঙ্কিত করে তোলে।
নিরুপায় হয়ে পরিবার জমি বিক্রি ও উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ২০ লাখ টাকা সংগ্রহ করে চক্রের নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলাদেশের একটি ব্যাংক হিসাবে পাঠায়। তবে অর্থ পাওয়ার পরও আসামিরা ভিকটিমদের মুক্তি না দিয়ে আরও অর্থ দাবি করতে থাকে এবং নির্যাতন চালিয়ে যায়।
এ ঘটনায় ভিকটিমদের পরিবার বাগমারা থানায় অভিযোগ দায়ের করলে থানার অফিসার ইনচার্জ জিল্লুর রহমান তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ অনুযায়ী একটি মামলা রুজু করা হয়।
মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় এসআই শিহাব উদ্দীনের ওপর। তার নেতৃত্বে একটি চৌকস দল তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা নজরদারি ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণের মাধ্যমে কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। এতে লিবিয়ায় অবস্থানরত অপহরণকারী চক্রের বাংলাদেশি সহযোগী ও ব্যাংক হিসাবধারীসহ মোট ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়।গ্রেফতারকৃতরা হলেন কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলার শ্রীনগর উত্তরপাড়া গ্রামের তারা মিয়ার ছেলে আল মামুন (৩৮), একই এলাকার মৃত সোনা মিয়ার ছেলে আব্দুল করিম (৪৭) এবং দক্ষিণহাটি মৌটুপি এলাকার সিদ্দিক মিয়ার স্ত্রী পরিষ্কার বেগম (৫৫)।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও তৎপরতায় লিবিয়ায় অবস্থানরত মূল চক্রের ওপর চাপ সৃষ্টি হলে তারা ভিকটিমদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় এবং লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে তাদের নিরাপদে পৌঁছে দেয়।
বর্তমানে ভিকটিমরা দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে নিরাপদে রয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে দ্রুত দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন।
বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিল্লুর রহমান বলেন, বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দালাল চক্রের প্রলোভনে না পড়ে সরকারি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশ যাওয়ার জন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে
তিনি আরও জানান, মানবপাচার ও আন্তঃদেশীয় অপহরণ চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের “জিরো টলারেন্স” নীতি অব্যাহত রয়েছে এবং পলাতক অন্যান্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলমান রয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

নওগাঁ জেলার বদলগাছীর ধোঁপাঘাটি শ্মশান থেকে এক ব্যক্তির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

মানবপাচার ও অপহরণ চক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার

Update Time : 06:59:11 pm, Sunday, 26 April 2026

স্টাফ রিপোর্টার,রাজশাহী:

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় মানবপাচার ও আন্তঃদেশীয় অপহরণ চক্রের বিরুদ্ধে সফল অভিযান পরিচালনা করেছে বাগমারা থানা পুলিশ। অভিযানে চক্রের সঙ্গে জড়িত ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং লিবিয়ায় আটকে পড়া ২ ভিকটিমকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বাগমারা উপজেলার যোগিপাড়া ইউনিয়নের বীরকুৎসা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক (৪৫) ও একই উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামের জিসান (২২) উন্নত জীবনের আশায় দালাল চক্রের মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার জন্য প্রায় ১০ লাখ টাকার চুক্তি করেন। কিন্তু প্রতারক চক্রটি তাদের ইতালিতে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে কৌশলে লিবিয়ায় পাচার করে।
লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তারা একটি সংঘবদ্ধ বাংলাদেশি মানবপাচারকারী চক্রের কবলে পড়ে। চক্রটি তাদের অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে জোরপূর্বক কঠোর শ্রমে নিয়োজিত করে এবং দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। তাদের পর্যাপ্ত খাদ্য ও বিশ্রাম থেকেও বঞ্চিত করা হয়, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
পরবর্তীতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অপহরণকারীরা ভিকটিমদের পরিবারের সঙ্গে ইমো অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। দাবির সত্যতা প্রমাণে তারা ভিকটিমদের ওপর নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও পাঠায়, যা পরিবারকে আতঙ্কিত করে তোলে।
নিরুপায় হয়ে পরিবার জমি বিক্রি ও উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ২০ লাখ টাকা সংগ্রহ করে চক্রের নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলাদেশের একটি ব্যাংক হিসাবে পাঠায়। তবে অর্থ পাওয়ার পরও আসামিরা ভিকটিমদের মুক্তি না দিয়ে আরও অর্থ দাবি করতে থাকে এবং নির্যাতন চালিয়ে যায়।
এ ঘটনায় ভিকটিমদের পরিবার বাগমারা থানায় অভিযোগ দায়ের করলে থানার অফিসার ইনচার্জ জিল্লুর রহমান তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ অনুযায়ী একটি মামলা রুজু করা হয়।
মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় এসআই শিহাব উদ্দীনের ওপর। তার নেতৃত্বে একটি চৌকস দল তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা নজরদারি ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণের মাধ্যমে কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। এতে লিবিয়ায় অবস্থানরত অপহরণকারী চক্রের বাংলাদেশি সহযোগী ও ব্যাংক হিসাবধারীসহ মোট ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়।গ্রেফতারকৃতরা হলেন কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলার শ্রীনগর উত্তরপাড়া গ্রামের তারা মিয়ার ছেলে আল মামুন (৩৮), একই এলাকার মৃত সোনা মিয়ার ছেলে আব্দুল করিম (৪৭) এবং দক্ষিণহাটি মৌটুপি এলাকার সিদ্দিক মিয়ার স্ত্রী পরিষ্কার বেগম (৫৫)।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও তৎপরতায় লিবিয়ায় অবস্থানরত মূল চক্রের ওপর চাপ সৃষ্টি হলে তারা ভিকটিমদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় এবং লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে তাদের নিরাপদে পৌঁছে দেয়।
বর্তমানে ভিকটিমরা দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে নিরাপদে রয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে দ্রুত দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন।
বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিল্লুর রহমান বলেন, বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দালাল চক্রের প্রলোভনে না পড়ে সরকারি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশ যাওয়ার জন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে
তিনি আরও জানান, মানবপাচার ও আন্তঃদেশীয় অপহরণ চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের “জিরো টলারেন্স” নীতি অব্যাহত রয়েছে এবং পলাতক অন্যান্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলমান রয়েছে।