Dhaka 7:06 am, Tuesday, 21 April 2026

ধর্ষণচেষ্টায় মামলায় পিভিআই তদন্তের ঘাতক গ্রেপ্তার ও বস্তা বন্দি শিশু মৃত্যু দেহ উদ্ধার

জাহাঙ্গীর আলম জেলা প্রতিনিধি,ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছয় বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থী নিশাত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে প্রতিবেশী অটোরিকশাচালক মোঃ ইসহাক মিয়া (ইছা মিয়া) শ্বাসরোধ করে শিশুটিকে হত্যা করে—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে পিবিআই।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে সদর উপজেলার মোহনপুর গ্রাম থেকে অভিযুক্ত ইসহাক মিয়াকে গ্রেফতার করে পিবিআই। তিনি অষ্টগ্রাম উত্তরপাড়া এলাকার মৃত জারু মিয়ার ছেলে এবং পেশায় একজন অটোরিকশাচালক।
পিবিআই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার সচীন চাকমা এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইসহাক মিয়া হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে এবং ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে, যা অত্যন্ত মর্মান্তিক ও উদ্বেগজনক।
ঘটনার সূত্রপাত ১৫ এপ্রিল। ওইদিন বিকেলে দোকান থেকে চিপস কিনতে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় নিশাত। দীর্ঘ সময়েও বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজতে শুরু করেন। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর নিখোঁজের দুইদিন পর, শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) দুপুরে বাড়ির পার্শ্ববর্তী একটি নির্জন খোলা জায়গা থেকে নিশাতের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে এবং ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
নিহতের মা আকলিমা আক্তার বাদী হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত অভিযুক্তকে শনাক্ত করে।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন দুপুরে মোহনপুর গ্রামের একটি স্কুলের সামনে নিশাতের সঙ্গে ইসহাক মিয়ার দেখা হয়। পরিচিত হওয়ার সুযোগে সে শিশুটিকে ঘোরানোর কথা বলে কৌশলে নবীনগর উপজেলার রসুলপুর এলাকার একটি পার্কে নিয়ে যায়। সেখানে সারাদিন সময় কাটানোর পর রাত ১০টার দিকে শিশুটিকে নিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে আসে।
সেদিন তার বাড়িতে অন্য কেউ উপস্থিত ছিল না, কারণ তার স্ত্রী ও সন্তানরা শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করছিল। একা থাকার সুযোগে রাতে অনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করে সে। এ সময় শিশুটি আতঙ্কিত হয়ে বিষয়টি তার মাকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বললে অভিযুক্ত ভয় পেয়ে যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং ঘটনা গোপন করতে ইসহাক মিয়া শিশুটির মুখ চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পরদিন পর্যন্ত মরদেহ ঘরের ভেতর লুকিয়ে রাখে এবং ১৭ এপ্রিল দুপুরে বাড়ির পাশের একটি ফাঁকা স্থানে বস্তাবন্দি করে ফেলে দেয়, যাতে ঘটনাটি অন্যদিকে প্রবাহিত করা যায়।
পিবিআই পুলিশ সুপার আরও জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত নৃশংস ও সংবেদনশীল। অভিযুক্তকে আদালতে সোপর্দ করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে এ ঘটনায় বিস্তারিত তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং যদি অন্য কেউ জড়িত থাকে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
এদিকে এ নির্মম হত্যাকাণ্ডে স্থানীয় এলাকায় শোক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। এলাকাবাসী ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অনেকেই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও কঠোর ভূমিকা কামনা করেছেন।
নিহত নিশাত মোহনপুর গ্রামের সৌদি প্রবাসী আবু সাদেক মিয়ার মেয়ে এবং স্থানীয় একটি স্কুলের নার্সারি শ্রেণির ছাত্রী ছিল। তার অকাল মৃত্যুতে পরিবারসহ পুরো এলাকায় শোকের মাতম চলছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ফাউন্ডেশন রাঙ্গামাটি জেলার আয়োজনে শাহাদাত বার্ষিকী আলোচনা মিলাদ অনুষ্ঠিত হয়েছে

ধর্ষণচেষ্টায় মামলায় পিভিআই তদন্তের ঘাতক গ্রেপ্তার ও বস্তা বন্দি শিশু মৃত্যু দেহ উদ্ধার

Update Time : 12:57:33 pm, Sunday, 19 April 2026

জাহাঙ্গীর আলম জেলা প্রতিনিধি,ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছয় বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থী নিশাত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে প্রতিবেশী অটোরিকশাচালক মোঃ ইসহাক মিয়া (ইছা মিয়া) শ্বাসরোধ করে শিশুটিকে হত্যা করে—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে পিবিআই।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে সদর উপজেলার মোহনপুর গ্রাম থেকে অভিযুক্ত ইসহাক মিয়াকে গ্রেফতার করে পিবিআই। তিনি অষ্টগ্রাম উত্তরপাড়া এলাকার মৃত জারু মিয়ার ছেলে এবং পেশায় একজন অটোরিকশাচালক।
পিবিআই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার সচীন চাকমা এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইসহাক মিয়া হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে এবং ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে, যা অত্যন্ত মর্মান্তিক ও উদ্বেগজনক।
ঘটনার সূত্রপাত ১৫ এপ্রিল। ওইদিন বিকেলে দোকান থেকে চিপস কিনতে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় নিশাত। দীর্ঘ সময়েও বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজতে শুরু করেন। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর নিখোঁজের দুইদিন পর, শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) দুপুরে বাড়ির পার্শ্ববর্তী একটি নির্জন খোলা জায়গা থেকে নিশাতের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে এবং ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
নিহতের মা আকলিমা আক্তার বাদী হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত অভিযুক্তকে শনাক্ত করে।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন দুপুরে মোহনপুর গ্রামের একটি স্কুলের সামনে নিশাতের সঙ্গে ইসহাক মিয়ার দেখা হয়। পরিচিত হওয়ার সুযোগে সে শিশুটিকে ঘোরানোর কথা বলে কৌশলে নবীনগর উপজেলার রসুলপুর এলাকার একটি পার্কে নিয়ে যায়। সেখানে সারাদিন সময় কাটানোর পর রাত ১০টার দিকে শিশুটিকে নিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে আসে।
সেদিন তার বাড়িতে অন্য কেউ উপস্থিত ছিল না, কারণ তার স্ত্রী ও সন্তানরা শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করছিল। একা থাকার সুযোগে রাতে অনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করে সে। এ সময় শিশুটি আতঙ্কিত হয়ে বিষয়টি তার মাকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বললে অভিযুক্ত ভয় পেয়ে যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং ঘটনা গোপন করতে ইসহাক মিয়া শিশুটির মুখ চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পরদিন পর্যন্ত মরদেহ ঘরের ভেতর লুকিয়ে রাখে এবং ১৭ এপ্রিল দুপুরে বাড়ির পাশের একটি ফাঁকা স্থানে বস্তাবন্দি করে ফেলে দেয়, যাতে ঘটনাটি অন্যদিকে প্রবাহিত করা যায়।
পিবিআই পুলিশ সুপার আরও জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত নৃশংস ও সংবেদনশীল। অভিযুক্তকে আদালতে সোপর্দ করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে এ ঘটনায় বিস্তারিত তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং যদি অন্য কেউ জড়িত থাকে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
এদিকে এ নির্মম হত্যাকাণ্ডে স্থানীয় এলাকায় শোক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। এলাকাবাসী ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অনেকেই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও কঠোর ভূমিকা কামনা করেছেন।
নিহত নিশাত মোহনপুর গ্রামের সৌদি প্রবাসী আবু সাদেক মিয়ার মেয়ে এবং স্থানীয় একটি স্কুলের নার্সারি শ্রেণির ছাত্রী ছিল। তার অকাল মৃত্যুতে পরিবারসহ পুরো এলাকায় শোকের মাতম চলছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।