Dhaka 10:04 am, Wednesday, 15 July 2026

হরমুজে বারুদের স্তূপে নতুন আতঙ্ক:ইরানে ব্যাপক মার্কিন হামলা,‘যুদ্ধবিরতি মৃত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক নিজস্ব প্রতিবেদক
​মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারও এক চরম অস্থিরতার পদধ্বনি। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধবিরতির আশা জেগেছিল, তা এখন ধ্বংসের মুখে। মার্কিন বাহিনী ইরানের সামরিক ও অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুতে একের পর এক বিমান হামলা চালানোর পর তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
​মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের অবস্থান ও সেন্টকমের বিবৃতি
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) নিশ্চিত করেছে যে, তাদের বাহিনী ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুদাগার এবং নৌ-অবকাঠামো লক্ষ্য করে প্রায় ৯০টি স্থাপনায় ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের ভাষ্যমতে, এই হামলার মূল উদ্দেশ্য হলো—আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের ওপর ইরানের ‘অবৈধ আক্রমণ’ প্রতিহত করা এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
​মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমরা তাদের ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছি। তাদের কর্মকাণ্ড অগ্রহণযোগ্য এবং এর চড়া মূল্য দিতে হবে”। পেন্টাগনের দাবি, ইরান যখনই কোনো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করবে বা জাহাজের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করবে, ওয়াশিংটন তার যথাযথ জবাব দেবে।
​ইরানের কঠোর প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা হুঁশিয়ারি
মার্কিন হামলার জবাবে তেহরানও অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলাকে ‘আগ্রাসন’ এবং ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ইরানের সামরিক কমান্ডের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ইরান তার জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না”।
​এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক বার্তায় ওয়াশিংটনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “একতরফা চুক্তির যুগ শেষ। আমরা আগেই সতর্ক করেছিলাম—কথা না রাখলে তার পরিণতি ভোগ করতে হবে”। ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনিও তার প্রথম আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তার পিতার (আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি) হত্যার বদলা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তেহরান ঘোষণা দিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকবে এবং প্রয়োজনে তারা অঞ্চলে মার্কিন ‘শত্রুঘাঁটিগুলোতে’ আরও হামলার বিষয়টি বিবেচনা করবে।
​বিশ্লেষকদের মত: কূটনৈতিক ব্যর্থতা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা’র পর যে শান্তির আশা তৈরি হয়েছিল, তা এখন কার্যত নিষ্ক্রিয়। ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি করায় এবং যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় একটি ‘ডেডলক’ বা অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
​হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা হয়। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এই উত্তেজনা যদি দ্রুত প্রশমিত না হয়, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আবারও বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। সামরিক উত্তেজনার পারদ যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে পুরো অঞ্চলটি ফের একটি বড় ধরনের যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
​জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের বিশ্লেষণমূলক মন্তব্য:
এই সংকটটি কেবল সামরিক নয়, এটি একটি কৌশলগত ক্ষমতার লড়াই। ইরান তার প্রক্সি নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে এবং হরমুজ প্রণালীকে ‘চোকপয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ-শক্তির মহড়া এবং আকাশপথের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মাধ্যমে ইরানকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে পঙ্গু করতে চাইছে। পরিস্থিতির গতি-প্রকৃতি নির্দেশ করছে, খুব শিগগিরই বড় ধরনের কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ না নিলে এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

নলডাঙ্গায় জাসাস নেতার পাওনাদার বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগের প্রতিবাদ

হরমুজে বারুদের স্তূপে নতুন আতঙ্ক:ইরানে ব্যাপক মার্কিন হামলা,‘যুদ্ধবিরতি মৃত

Update Time : 11:00:29 pm, Sunday, 12 July 2026

আন্তর্জাতিক ডেস্ক নিজস্ব প্রতিবেদক
​মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারও এক চরম অস্থিরতার পদধ্বনি। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধবিরতির আশা জেগেছিল, তা এখন ধ্বংসের মুখে। মার্কিন বাহিনী ইরানের সামরিক ও অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুতে একের পর এক বিমান হামলা চালানোর পর তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
​মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের অবস্থান ও সেন্টকমের বিবৃতি
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) নিশ্চিত করেছে যে, তাদের বাহিনী ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুদাগার এবং নৌ-অবকাঠামো লক্ষ্য করে প্রায় ৯০টি স্থাপনায় ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের ভাষ্যমতে, এই হামলার মূল উদ্দেশ্য হলো—আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের ওপর ইরানের ‘অবৈধ আক্রমণ’ প্রতিহত করা এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
​মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমরা তাদের ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছি। তাদের কর্মকাণ্ড অগ্রহণযোগ্য এবং এর চড়া মূল্য দিতে হবে”। পেন্টাগনের দাবি, ইরান যখনই কোনো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করবে বা জাহাজের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করবে, ওয়াশিংটন তার যথাযথ জবাব দেবে।
​ইরানের কঠোর প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা হুঁশিয়ারি
মার্কিন হামলার জবাবে তেহরানও অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলাকে ‘আগ্রাসন’ এবং ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ইরানের সামরিক কমান্ডের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ইরান তার জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না”।
​এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক বার্তায় ওয়াশিংটনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “একতরফা চুক্তির যুগ শেষ। আমরা আগেই সতর্ক করেছিলাম—কথা না রাখলে তার পরিণতি ভোগ করতে হবে”। ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনিও তার প্রথম আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তার পিতার (আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি) হত্যার বদলা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তেহরান ঘোষণা দিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকবে এবং প্রয়োজনে তারা অঞ্চলে মার্কিন ‘শত্রুঘাঁটিগুলোতে’ আরও হামলার বিষয়টি বিবেচনা করবে।
​বিশ্লেষকদের মত: কূটনৈতিক ব্যর্থতা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা’র পর যে শান্তির আশা তৈরি হয়েছিল, তা এখন কার্যত নিষ্ক্রিয়। ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি করায় এবং যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় একটি ‘ডেডলক’ বা অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
​হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা হয়। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এই উত্তেজনা যদি দ্রুত প্রশমিত না হয়, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আবারও বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। সামরিক উত্তেজনার পারদ যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে পুরো অঞ্চলটি ফের একটি বড় ধরনের যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
​জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের বিশ্লেষণমূলক মন্তব্য:
এই সংকটটি কেবল সামরিক নয়, এটি একটি কৌশলগত ক্ষমতার লড়াই। ইরান তার প্রক্সি নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে এবং হরমুজ প্রণালীকে ‘চোকপয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ-শক্তির মহড়া এবং আকাশপথের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মাধ্যমে ইরানকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে পঙ্গু করতে চাইছে। পরিস্থিতির গতি-প্রকৃতি নির্দেশ করছে, খুব শিগগিরই বড় ধরনের কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ না নিলে এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।