
স্টাফ রিপোর্টার: মোঃ বুলবুল আহম্মেদ
মোবাইল ফোনে পরিচয়ের মাধ্যমে প্রেম, এরপর এফিডেভিট ও পরবর্তীতে পারিবারিকভাবে রেজিস্ট্রি বিয়ে। কিন্তু দাম্পত্য জীবনের কিছুদিনের মধ্যেই যৌতুকের দাবিতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, স্বর্ণালংকার আত্মসাৎ, মাদকাসক্তি, অনলাইনে জুয়া খেলা এবং ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে মানহানির অভিযোগ তুলে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার এক গৃহবধূ।
মামলার অভিযোগ ও ভুক্তভোগী পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিলেট জেলার ওসমানীনগর উপজেলার চানপুর গ্রামের শেখ মোহাম্মদ ছিদ্দিক আলীর ছেলে শেখ মোহাম্মদ হায়দার আলীর সঙ্গে মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার সালন গ্রামের হাজী চান মিয়ার মেয়ে রাফি বেগমের মোবাইল ফোনে পরিচয় হয়। আত্মীয় পরিচয়ে শুরু হওয়া কথোপকথন ধীরে ধীরে প্রেমের সম্পর্কে রূপ নেয়।
অভিযোগে বলা হয়, প্রেমের সময় হায়দার আলী নিজেকে সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালী পরিবারের সন্তান হিসেবে পরিচয় দেন। বাড়ি-গাড়ি ও আর্থিক সচ্ছলতার নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি রাফি বেগমের আস্থা অর্জন করেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল হবিগঞ্জ নোটারি পাবলিক কার্যালয়ে এফিডেভিটের মাধ্যমে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর স্ত্রীকে নিজ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাস শুরু করেন।
তবে কিছুদিনের মধ্যেই তাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে বিচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তীতে উভয় পক্ষের আত্মীয়-স্বজনের উদ্যোগে সমঝোতা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল তালাকের নোটিশ প্রত্যাহার করা হয় এবং পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর (মামলার নথিতে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী) ৬ লাখ টাকা দেনমোহরে শরিয়াহ মোতাবেক পুনরায় রেজিস্ট্রি বিয়ে সম্পন্ন হয়।
বাদীপক্ষের দাবি, বিয়ের সময় মেয়ের পরিবার জামাতাকে আসবাবপত্র কেনার জন্য নগদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রদান করে। এছাড়া প্রায় ৩ ভরি স্বর্ণালংকারও দেওয়া হয়, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬ লাখ টাকার বেশি। কিন্তু সেই অর্থ ও স্বর্ণ সংসারের কাজে ব্যবহার না করে মাদক সেবন ও অনলাইন জুয়ার পেছনে ব্যয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিয়ের পর থেকেই স্বামী হায়দার আলী এবং তার খালা রানী চৌধুরী বিভিন্ন সময় রাফি বেগমের ওপর বাবার বাড়ি থেকে টাকা আনার জন্য চাপ সৃষ্টি করতেন। কয়েক দফা টাকা দেওয়ার পরও তারা কাতারে পাঠানোর কথা বলে আরও ৫ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। ওই টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাকে মারধর, গালিগালাজ, চুল ধরে টেনে হিঁচড়ে নির্যাতন এবং সংসার থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
রাফি বেগমের অভিযোগ, তার স্বামী ও খালার পরামর্শে তার গলা, হাত ও কানের স্বর্ণালংকার খুলে বিক্রি করা হয় এবং বিক্রির টাকা রানী চৌধুরীর কাছে রাখা হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি।
ভুক্তভোগী আরও দাবি করেন, তার স্বামী নিয়মিত মাদক সেবন করতেন এবং অনলাইনে জুয়া খেলতেন। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলেই তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি বারবার বাবার বাড়ি থেকে টাকা এনে দিলেও নির্যাতনের মাত্রা কমেনি।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে অভিযুক্ত স্বামী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও টিকটকে স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও গোপনীয় ছবি এবং ভিডিও প্রকাশ করেন। এতে ভুক্তভোগী, তার পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও মানহানিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন বাদীপক্ষ।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বিষয়টি প্রথমে আদালতের বাইরে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়। এ লক্ষ্যে মৌলভীবাজার জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে আবেদন করা হলে উভয় পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে আপস-মীমাংসা না হওয়ায় ২০২৬ সালের ১৫ জুন চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার মধ্যস্থতা ব্যর্থ হওয়ার প্রতিবেদন দেন এবং আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেন।
এরপর গত ২৩ জুন ২০২৬ তারিখে ভুক্তভোগী রাফি বেগম মৌলভীবাজার বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যৌতুক ও নির্যাতনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও প্রকাশের ঘটনায় সাইবার ট্রাইব্যুনালেও পৃথক মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
ভুক্তভোগী পরিবার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শেখ মোহাম্মদ হায়দার আলীর বক্তব্য জানার জন্য প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে ভবিষ্যতে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
প্রেরক:
বুলবুল আহমেদ
নবীগঞ্জ, হবিগঞ্জ প্রতিনিধি
তারিখ: ৩০ জুন ২০২৬
মোঃ বুলবুল আহম্মেদ 




















