Dhaka 7:05 am, Monday, 3 August 2026

উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি,বাস্তবে দুর্ভোগ: কালিয়াকৈর পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা অবকাঠামো ও নাগরিক সেবার সংকট

মো.নাহিদ চৌধুরী
গাজীপুর বিশেষ প্রতিনিধি

শিল্প ও বাণিজ্যনির্ভর গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌরসভা দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও নাগরিক সেবার চিত্র নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে বাসিন্দাদের মধ্যে। বিশেষ করে পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ভাঙাচোরা সড়ক, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধার কারণে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ডেনিম এশিয়া-২ নম্বর গেট সংলগ্ন এলাকায় পানি নিষ্কাশনের জন্য অত্যন্ত সংকীর্ণ পথ রাখা হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় এবং দীর্ঘ সময় পানি আটকে থাকে। বিগত মাসে ভারী বৃষ্টিতে এলাকা প্লাবিত হওয়ার পর জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিদর্শন করে ড্রেন ভেঙে প্রশস্ত করার আশ্বাস দিলেও এক মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো কাজ শুরু হয়নি।

এলাকাবাসী জানান, ডেনিম এশিয়া-২ নম্বর গেট এলাকায় অল্প বৃষ্টিতেই প্রায় ৫০টির বেশি দোকানপাটের সামনে পানি জমে যায়। সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতায় অন্তত ৪৫টি দোকানে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদের লাখ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হয়েছে। শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই নয়, শত শত বাড়িঘর ও কালভার্ট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সফিপুর উত্তরপাড়া এলাকাবাসী জানান, ওই এলাকার খালের মাধ্যমে প্রায় ১৫টি গ্রামের পানি নিষ্কাশন হয়। যদিও উত্তরপাড়া বহু আগেই পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তবুও সেখানে এখনো পর্যন্ত পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তাদের দাবি, খালের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত আধুনিক ড্রেন নির্মাণ করা না হলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে দুই-এক ঘণ্টার মধ্যেই বৃষ্টির পানি নেমে যেত। বর্তমানে পানি নামতে পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এর ফলে বাড়িঘর, দোকানপাট এবং স্থানীয় সড়কগুলো দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকায় জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করছে।

এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, ময়লা অপসারণের জন্য প্রতি পরিবার থেকে বর্তমানে মাসিক ১৫০ টাকা করে আদায় করা হলেও সেবার মানে তেমন কোনো উন্নতি নেই। অনেক এলাকায় নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ না হওয়ায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং মশা-মাছির উপদ্রব বেড়েছে। এতে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা।

এছাড়া রাতের বেলায় পর্যাপ্ত স্ট্রিটলাইট না থাকায় নারী, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কিছু এলাকায় ছিনতাই, চুরি ও মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির অভিযোগ তুলে নিয়মিত পুলিশি টহল জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ, খেলার মাঠ, শিশুদের বিনোদনকেন্দ্র, উন্মুক্ত পার্ক, গণশৌচাগার এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধারও ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। বাজার এলাকায় অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল ও যানজটের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল কষ্টকর হয়ে উঠেছে। জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্সসহ সেবামূলক যানবাহন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও ড্রেন দখল, নির্মাণকাজে তদারকির অভাব এবং রাস্তা খুঁড়ে দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় নাগরিক দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

এ বিষয়ে এলাকাবাসী দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পৌর কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাদের দাবি, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সড়ক সংস্কার, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, পর্যাপ্ত স্ট্রিটলাইট, বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা, কার্যকর মশকনিধন কর্মসূচি, উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন নিশ্চিত করা হলে কালিয়াকৈর পৌরসভা একটি আধুনিক, নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৌরসভায় পরিণত হতে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বোয়ালিয়া মডেল থানা প্রাঙ্গণে ফলজ-বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ

উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি,বাস্তবে দুর্ভোগ: কালিয়াকৈর পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা অবকাঠামো ও নাগরিক সেবার সংকট

Update Time : 10:56:06 pm, Sunday, 12 July 2026

মো.নাহিদ চৌধুরী
গাজীপুর বিশেষ প্রতিনিধি

শিল্প ও বাণিজ্যনির্ভর গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌরসভা দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও নাগরিক সেবার চিত্র নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে বাসিন্দাদের মধ্যে। বিশেষ করে পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ভাঙাচোরা সড়ক, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধার কারণে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ডেনিম এশিয়া-২ নম্বর গেট সংলগ্ন এলাকায় পানি নিষ্কাশনের জন্য অত্যন্ত সংকীর্ণ পথ রাখা হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় এবং দীর্ঘ সময় পানি আটকে থাকে। বিগত মাসে ভারী বৃষ্টিতে এলাকা প্লাবিত হওয়ার পর জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিদর্শন করে ড্রেন ভেঙে প্রশস্ত করার আশ্বাস দিলেও এক মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো কাজ শুরু হয়নি।

এলাকাবাসী জানান, ডেনিম এশিয়া-২ নম্বর গেট এলাকায় অল্প বৃষ্টিতেই প্রায় ৫০টির বেশি দোকানপাটের সামনে পানি জমে যায়। সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতায় অন্তত ৪৫টি দোকানে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদের লাখ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হয়েছে। শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই নয়, শত শত বাড়িঘর ও কালভার্ট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সফিপুর উত্তরপাড়া এলাকাবাসী জানান, ওই এলাকার খালের মাধ্যমে প্রায় ১৫টি গ্রামের পানি নিষ্কাশন হয়। যদিও উত্তরপাড়া বহু আগেই পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তবুও সেখানে এখনো পর্যন্ত পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তাদের দাবি, খালের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত আধুনিক ড্রেন নির্মাণ করা না হলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে দুই-এক ঘণ্টার মধ্যেই বৃষ্টির পানি নেমে যেত। বর্তমানে পানি নামতে পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এর ফলে বাড়িঘর, দোকানপাট এবং স্থানীয় সড়কগুলো দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকায় জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করছে।

এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, ময়লা অপসারণের জন্য প্রতি পরিবার থেকে বর্তমানে মাসিক ১৫০ টাকা করে আদায় করা হলেও সেবার মানে তেমন কোনো উন্নতি নেই। অনেক এলাকায় নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ না হওয়ায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং মশা-মাছির উপদ্রব বেড়েছে। এতে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা।

এছাড়া রাতের বেলায় পর্যাপ্ত স্ট্রিটলাইট না থাকায় নারী, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কিছু এলাকায় ছিনতাই, চুরি ও মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির অভিযোগ তুলে নিয়মিত পুলিশি টহল জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ, খেলার মাঠ, শিশুদের বিনোদনকেন্দ্র, উন্মুক্ত পার্ক, গণশৌচাগার এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধারও ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। বাজার এলাকায় অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল ও যানজটের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল কষ্টকর হয়ে উঠেছে। জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্সসহ সেবামূলক যানবাহন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও ড্রেন দখল, নির্মাণকাজে তদারকির অভাব এবং রাস্তা খুঁড়ে দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় নাগরিক দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

এ বিষয়ে এলাকাবাসী দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পৌর কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাদের দাবি, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সড়ক সংস্কার, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, পর্যাপ্ত স্ট্রিটলাইট, বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা, কার্যকর মশকনিধন কর্মসূচি, উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন নিশ্চিত করা হলে কালিয়াকৈর পৌরসভা একটি আধুনিক, নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৌরসভায় পরিণত হতে পারে।