Dhaka 4:16 pm, Monday, 15 June 2026

জালালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ, প্রধান শিক্ষককে ঘিরে তীব্র বিতর্ক

আব্দুল্লাহ আল মামুন,যশোর প্রতিনিধি

যশোরের মণিরামপুর উপজেলার জালালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে ‘পরিবারতন্ত্র’, নিয়োগ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শিক্ষা প্রশাসনের নীতিমালা লঙ্ঘনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে প্রধান শিক্ষক মো. আমানত আলীর বিরুদ্ধে। স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষক, সাবেক শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, বিদ্যালয়টি ধীরে ধীরে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও আত্মীয়নির্ভর ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. আমানত আলী। একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন তার স্ত্রী, ভাই, বোনজামাই এবং বোনের নাতিসহ একাধিক আত্মীয়স্বজন। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই পরিবারের এত সংখ্যক সদস্যের চাকরি পাওয়া স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্র আরও জানায়, সম্প্রতি অতীতের তারিখ ব্যবহার করে নতুন করে তিনটি পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের নিয়মিত রেজুলেশন ছাড়াই তৎকালীন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত কিছু নথি ব্যবহার করে এসব নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্টদের এমপিওভুক্ত করার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ সংক্রান্ত অধিকাংশ সিদ্ধান্ত গোপনে নেওয়া হয়। কখন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়, কারা আবেদন করেন কিংবা কীভাবে নিয়োগ সম্পন্ন হয়—এসব বিষয়ে অধিকাংশ শিক্ষকই অবগত থাকেন না। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর বিষয়টি জানাজানি হয়।

রোববার (১৩ জুন) সকালে কথিত তিনটি নতুন নিয়োগের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে স্থানীয় অভিভাবক, এলাকাবাসী ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারা বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় প্রধান শিক্ষক তাদের সঙ্গে অশালীন আচরণ ও দুর্ব্যবহার করেন। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে তিনি সেখান থেকে চলে যান।

এদিকে বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা নিজেকে প্রধান শিক্ষক আমানত আলীর প্রথম স্ত্রী দাবি করে বলেন, দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের পরও তিনি পরিবার ও সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করেননি। তার অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন এবং বর্তমানে আলাদা বসবাস করছেন। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষিকা অভিযোগ করে বলেন, “সরকারি নিয়োগে আসা কয়েকজন শিক্ষক ছাড়া অধিকাংশ শিক্ষক-কর্মচারী প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত। ফলে অনিয়মের বিরুদ্ধে অনেকেই কথা বলতে ভয় পান। চাকরি হারানোর আশঙ্কায় তারা নীরব থাকতে বাধ্য হন।”

স্থানীয় অভিভাবকদের ভাষ্য, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও আদর্শিক শিক্ষার কেন্দ্র হওয়ার কথা। সেখানে যদি নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে শিক্ষার্থীদের সামনে কী ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে—সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রধান শিক্ষক মো. আমানত আলীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন এবং পরে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতি ও মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সম্রাট হোসেন বলেন, “উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

জালালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ এখন স্থানীয় জনমনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বজনপ্রীতি, নিয়োগ বাণিজ্য ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ কতটা সত্য—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শিক্ষার পরিবেশ ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষায় দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।বিকল্প শিরোনাম:

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

বাগমারার গোয়ালকান্দিতে মাদকের বিস্তার: প্রশাসনের নজরদারি দুর্বলতার অভিযোগ

জালালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ, প্রধান শিক্ষককে ঘিরে তীব্র বিতর্ক

Update Time : 01:22:45 pm, Monday, 15 June 2026

আব্দুল্লাহ আল মামুন,যশোর প্রতিনিধি

যশোরের মণিরামপুর উপজেলার জালালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে ‘পরিবারতন্ত্র’, নিয়োগ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শিক্ষা প্রশাসনের নীতিমালা লঙ্ঘনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে প্রধান শিক্ষক মো. আমানত আলীর বিরুদ্ধে। স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষক, সাবেক শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, বিদ্যালয়টি ধীরে ধীরে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও আত্মীয়নির্ভর ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. আমানত আলী। একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন তার স্ত্রী, ভাই, বোনজামাই এবং বোনের নাতিসহ একাধিক আত্মীয়স্বজন। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই পরিবারের এত সংখ্যক সদস্যের চাকরি পাওয়া স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্র আরও জানায়, সম্প্রতি অতীতের তারিখ ব্যবহার করে নতুন করে তিনটি পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের নিয়মিত রেজুলেশন ছাড়াই তৎকালীন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত কিছু নথি ব্যবহার করে এসব নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্টদের এমপিওভুক্ত করার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ সংক্রান্ত অধিকাংশ সিদ্ধান্ত গোপনে নেওয়া হয়। কখন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়, কারা আবেদন করেন কিংবা কীভাবে নিয়োগ সম্পন্ন হয়—এসব বিষয়ে অধিকাংশ শিক্ষকই অবগত থাকেন না। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর বিষয়টি জানাজানি হয়।

রোববার (১৩ জুন) সকালে কথিত তিনটি নতুন নিয়োগের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে স্থানীয় অভিভাবক, এলাকাবাসী ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারা বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় প্রধান শিক্ষক তাদের সঙ্গে অশালীন আচরণ ও দুর্ব্যবহার করেন। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে তিনি সেখান থেকে চলে যান।

এদিকে বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা নিজেকে প্রধান শিক্ষক আমানত আলীর প্রথম স্ত্রী দাবি করে বলেন, দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের পরও তিনি পরিবার ও সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করেননি। তার অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন এবং বর্তমানে আলাদা বসবাস করছেন। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষিকা অভিযোগ করে বলেন, “সরকারি নিয়োগে আসা কয়েকজন শিক্ষক ছাড়া অধিকাংশ শিক্ষক-কর্মচারী প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত। ফলে অনিয়মের বিরুদ্ধে অনেকেই কথা বলতে ভয় পান। চাকরি হারানোর আশঙ্কায় তারা নীরব থাকতে বাধ্য হন।”

স্থানীয় অভিভাবকদের ভাষ্য, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও আদর্শিক শিক্ষার কেন্দ্র হওয়ার কথা। সেখানে যদি নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে শিক্ষার্থীদের সামনে কী ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে—সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রধান শিক্ষক মো. আমানত আলীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন এবং পরে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতি ও মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সম্রাট হোসেন বলেন, “উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

জালালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ এখন স্থানীয় জনমনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বজনপ্রীতি, নিয়োগ বাণিজ্য ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ কতটা সত্য—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শিক্ষার পরিবেশ ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষায় দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।বিকল্প শিরোনাম: