Dhaka 7:07 pm, Thursday, 25 June 2026

বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নিখোঁজ সজীবকে ৪০ দিন পর মায়ের বুকে ফিরিয়ে দিল পুলিশ

মোঃ শিহাব উদ্দিন গোপালগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:-

দীর্ঘ প্রায় ৪০ দিন নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে সজীব (২২) নামের এক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী যুবক। গোপালগঞ্জ সদর থানা পুলিশের নিরলস প্রচেষ্টা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগে তার সন্ধান পাওয়া সম্ভব হয়েছে। পরে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ছেলেকে ফিরে পেয়ে আনন্দে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন সজীবের মা।

 

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পুরাতন মানিকদাহ এলাকার বাসিন্দা সজীব কিছুটা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হলেও অত্যন্ত শান্ত ও নিরীহ স্বভাবের। স্থানীয়ভাবে তিনি পরিচিত মুখ ছিলেন। বিশেষ করে গোপালগঞ্জ পুলিশ অফিস ও সদর থানার আশপাশে তাকে প্রায়ই ঘোরাফেরা করতে দেখা যেত। পুলিশের প্রতি তার ছিল বিশেষ দুর্বলতা। পুলিশের পোশাক পরা কাউকে দেখলেই তিনি সম্মান জানিয়ে স্যালুট দিতেন।

 

গত ১৫ মে হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যান সজীব। পরিবারের সদস্যরা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি। পরবর্তীতে ২০ মে গোপালগঞ্জ সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করা হয়। এরপর থেকেই তাকে খুঁজে বের করতে সক্রিয় হয় পুলিশ।

 

অনুসন্ধানের একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও পুলিশের নজরে আসে। ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন ব্লগার আরিফ হায়দার। সেখানে দেখা যায়, পুলিশের পোশাক পরিহিত এক যুবক ঢাকার মগবাজার ফ্লাইওভারের আশপাশে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং নিজেকে ‘সজীব পুলিশ’ বলে পরিচয় দিচ্ছেন। ভিডিওটি দেখে পুলিশের সন্দেহ হয় যে ওই যুবক নিখোঁজ সজীব হতে পারেন।

 

এরপর গোপালগঞ্জ সদর থানার একটি বিশেষ টিম ঢাকায় গিয়ে মগবাজার, মালিবাগ, রমনা, পল্টন, কাকরাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক অনুসন্ধান চালায়। তবে প্রথম দফার অভিযানে তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।

 

পরে গোপালগঞ্জ সদর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) নয়ন চন্দ্র দেবনাথ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও সংশ্লিষ্ট থানার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। রমনা, শাহবাগ, পল্টন ও মতিঝিল থানাসহ বিভিন্ন ইউনিটে সজীবের ছবি ও পরিচয় পাঠানো হয়। ডিএমপির কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে ট্রাফিক বিভাগ ও অপরাধ বিভাগেও তথ্য সরবরাহ করা হয়। একই সঙ্গে ভিডিও প্রকাশকারী ব্লগারের সঙ্গেও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখা হয়।

 

দীর্ঘ অনুসন্ধান ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের একপর্যায়ে গত ২৪ জুন বিকেলে সজীবের অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয় পুলিশ। পরে তাকে উদ্ধার করে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

 

গোপালগঞ্জ সদর থানা সূত্রে জানা গেছে, সজীবকে তার মায়ের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার সময় এক আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। পুলিশ সদস্যরা ফুল দিয়ে তাকে বরণ করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন। দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ছেলেকে ফিরে পেয়ে আনন্দে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার মা। পরিবারের অন্য সদস্যরাও পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

 

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, নিখোঁজ এক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী যুবককে খুঁজে বের করতে পুলিশের এমন আন্তরিকতা ও মানবিক উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তারা গোপালগঞ্জ সদর থানা পুলিশের এ প্রচেষ্টাকে মানবিক পুলিশিংয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।

এ ঘটনায় গোপালগঞ্জ সদর থানা পুলিশের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং দীর্ঘ অনুসন্ধান কার্যক্রম স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। পুলিশের এমন মানবিক উদ্যোগ সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস আরও সুদৃঢ় করবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ঘনঘন লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে মৌচাকে বিক্ষোভ পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও ও স্মারকলিপি প্রদান

বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নিখোঁজ সজীবকে ৪০ দিন পর মায়ের বুকে ফিরিয়ে দিল পুলিশ

Update Time : 05:18:33 pm, Thursday, 25 June 2026

মোঃ শিহাব উদ্দিন গোপালগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:-

দীর্ঘ প্রায় ৪০ দিন নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে সজীব (২২) নামের এক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী যুবক। গোপালগঞ্জ সদর থানা পুলিশের নিরলস প্রচেষ্টা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগে তার সন্ধান পাওয়া সম্ভব হয়েছে। পরে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ছেলেকে ফিরে পেয়ে আনন্দে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন সজীবের মা।

 

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পুরাতন মানিকদাহ এলাকার বাসিন্দা সজীব কিছুটা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হলেও অত্যন্ত শান্ত ও নিরীহ স্বভাবের। স্থানীয়ভাবে তিনি পরিচিত মুখ ছিলেন। বিশেষ করে গোপালগঞ্জ পুলিশ অফিস ও সদর থানার আশপাশে তাকে প্রায়ই ঘোরাফেরা করতে দেখা যেত। পুলিশের প্রতি তার ছিল বিশেষ দুর্বলতা। পুলিশের পোশাক পরা কাউকে দেখলেই তিনি সম্মান জানিয়ে স্যালুট দিতেন।

 

গত ১৫ মে হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যান সজীব। পরিবারের সদস্যরা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি। পরবর্তীতে ২০ মে গোপালগঞ্জ সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করা হয়। এরপর থেকেই তাকে খুঁজে বের করতে সক্রিয় হয় পুলিশ।

 

অনুসন্ধানের একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও পুলিশের নজরে আসে। ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন ব্লগার আরিফ হায়দার। সেখানে দেখা যায়, পুলিশের পোশাক পরিহিত এক যুবক ঢাকার মগবাজার ফ্লাইওভারের আশপাশে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং নিজেকে ‘সজীব পুলিশ’ বলে পরিচয় দিচ্ছেন। ভিডিওটি দেখে পুলিশের সন্দেহ হয় যে ওই যুবক নিখোঁজ সজীব হতে পারেন।

 

এরপর গোপালগঞ্জ সদর থানার একটি বিশেষ টিম ঢাকায় গিয়ে মগবাজার, মালিবাগ, রমনা, পল্টন, কাকরাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক অনুসন্ধান চালায়। তবে প্রথম দফার অভিযানে তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।

 

পরে গোপালগঞ্জ সদর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) নয়ন চন্দ্র দেবনাথ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও সংশ্লিষ্ট থানার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। রমনা, শাহবাগ, পল্টন ও মতিঝিল থানাসহ বিভিন্ন ইউনিটে সজীবের ছবি ও পরিচয় পাঠানো হয়। ডিএমপির কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে ট্রাফিক বিভাগ ও অপরাধ বিভাগেও তথ্য সরবরাহ করা হয়। একই সঙ্গে ভিডিও প্রকাশকারী ব্লগারের সঙ্গেও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখা হয়।

 

দীর্ঘ অনুসন্ধান ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের একপর্যায়ে গত ২৪ জুন বিকেলে সজীবের অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয় পুলিশ। পরে তাকে উদ্ধার করে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

 

গোপালগঞ্জ সদর থানা সূত্রে জানা গেছে, সজীবকে তার মায়ের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার সময় এক আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। পুলিশ সদস্যরা ফুল দিয়ে তাকে বরণ করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন। দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ছেলেকে ফিরে পেয়ে আনন্দে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার মা। পরিবারের অন্য সদস্যরাও পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

 

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, নিখোঁজ এক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী যুবককে খুঁজে বের করতে পুলিশের এমন আন্তরিকতা ও মানবিক উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তারা গোপালগঞ্জ সদর থানা পুলিশের এ প্রচেষ্টাকে মানবিক পুলিশিংয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।

এ ঘটনায় গোপালগঞ্জ সদর থানা পুলিশের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং দীর্ঘ অনুসন্ধান কার্যক্রম স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। পুলিশের এমন মানবিক উদ্যোগ সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস আরও সুদৃঢ় করবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।