Dhaka 3:42 am, Wednesday, 24 June 2026

বেজরা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অবৈধ, নিয়োগ বাণিজ্য ও কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ; তদন্তের দাবি

নিজস্ব সংবাদদাতা মোঃ শাহজাহান বাশার

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বেজরা উচ্চ বিদ্যালয়ের (EIIN: ১০৫২২০) প্রধান শিক্ষক মো. গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে অবৈধ নিয়োগ, নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, আর্থিক অনিয়ম এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির স্বাক্ষরিত পৃথক আবেদন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, কুমিল্লার বিদ্যালয় পরিদর্শক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, মো. গিয়াস উদ্দিন ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং ১ মে ২০০০ সালে এমপিওভুক্ত হন। কিন্তু বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও আরও সিনিয়র শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও বিধিবহির্ভূতভাবে তৎকালীন সভাপতির সহযোগিতায় ২১ নভেম্বর ২০১০ সালে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এবং পরবর্তীতে ১৭ নভেম্বর ২০১২ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করলেই প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।

শুধু নিয়োগ অনিয়মই নয়, বিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ভর্তি ফি, মাসিক বেতন, জরিমানা, ফরম পূরণসহ বিভিন্ন খাতে আদায়কৃত অর্থ বিধি অনুযায়ী ব্যাংকে জমা না করে নগদে গ্রহণ এবং ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে ব্যয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ক্যাশবুকে সঠিক হিসাব সংরক্ষণ না করা এবং ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের অসঙ্গতির বিষয়টিও অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রতি বছর সরকারি অডিট এবং প্রতি তিন মাস অন্তর অভ্যন্তরীণ অডিট বাধ্যতামূলক হলেও গত প্রায় ১৭ বছর ধরে কোনো অডিট সম্পন্ন করা হয়নি। ফলে বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের প্রকৃত হিসাব গোপন রাখা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

এছাড়াও সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রাপ্ত টি.আর., কাবিখা, এডিবি, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করে আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, ক্যাশবুক এবং ব্যাংক হিসাব যাচাই করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করা হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ হলো, প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাৎ করে ব্রাহ্মণপাড়া সদরে ওশান স্কুল সংলগ্ন এলাকায় “ভাই ভাই ভিলা” নামে একটি পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করেছেন মো. গিয়াস উদ্দিন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, একজন প্রধান শিক্ষকের বেতন-ভাতার আয়ে এমন বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া প্রশ্নের জন্ম দেয়। তাই তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগকারীরা প্রধান শিক্ষকের নিয়োগ প্রক্রিয়া, বিদ্যালয়ের আর্থিক লেনদেন, ক্যাশবুক, ব্যাংক হিসাব, অডিট প্রতিবেদন এবং সম্পদের উৎস তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, অভিযোগটি তাঁর দপ্তরে পৌঁছেছে এবং ইতোমধ্যে একজন তদন্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মো. গিয়াস উদ্দিনের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, আবেদনপত্রে উত্থাপিত অভিযোগগুলো অভিযোগকারীদের দাবি মাত্র। এখন পর্যন্ত কোনো তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত শেষে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

Re ক্যাডেট এএসআই (নিরস্ত্র) নিয়োগ-২০২৬ উপলক্ষে ব্রিফিং অনুষ্ঠিত

বেজরা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অবৈধ, নিয়োগ বাণিজ্য ও কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ; তদন্তের দাবি

Update Time : 07:07:04 pm, Tuesday, 23 June 2026

নিজস্ব সংবাদদাতা মোঃ শাহজাহান বাশার

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বেজরা উচ্চ বিদ্যালয়ের (EIIN: ১০৫২২০) প্রধান শিক্ষক মো. গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে অবৈধ নিয়োগ, নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, আর্থিক অনিয়ম এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির স্বাক্ষরিত পৃথক আবেদন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, কুমিল্লার বিদ্যালয় পরিদর্শক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, মো. গিয়াস উদ্দিন ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং ১ মে ২০০০ সালে এমপিওভুক্ত হন। কিন্তু বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও আরও সিনিয়র শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও বিধিবহির্ভূতভাবে তৎকালীন সভাপতির সহযোগিতায় ২১ নভেম্বর ২০১০ সালে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এবং পরবর্তীতে ১৭ নভেম্বর ২০১২ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করলেই প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।

শুধু নিয়োগ অনিয়মই নয়, বিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ভর্তি ফি, মাসিক বেতন, জরিমানা, ফরম পূরণসহ বিভিন্ন খাতে আদায়কৃত অর্থ বিধি অনুযায়ী ব্যাংকে জমা না করে নগদে গ্রহণ এবং ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে ব্যয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ক্যাশবুকে সঠিক হিসাব সংরক্ষণ না করা এবং ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের অসঙ্গতির বিষয়টিও অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রতি বছর সরকারি অডিট এবং প্রতি তিন মাস অন্তর অভ্যন্তরীণ অডিট বাধ্যতামূলক হলেও গত প্রায় ১৭ বছর ধরে কোনো অডিট সম্পন্ন করা হয়নি। ফলে বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের প্রকৃত হিসাব গোপন রাখা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

এছাড়াও সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রাপ্ত টি.আর., কাবিখা, এডিবি, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করে আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, ক্যাশবুক এবং ব্যাংক হিসাব যাচাই করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করা হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ হলো, প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাৎ করে ব্রাহ্মণপাড়া সদরে ওশান স্কুল সংলগ্ন এলাকায় “ভাই ভাই ভিলা” নামে একটি পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করেছেন মো. গিয়াস উদ্দিন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, একজন প্রধান শিক্ষকের বেতন-ভাতার আয়ে এমন বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া প্রশ্নের জন্ম দেয়। তাই তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগকারীরা প্রধান শিক্ষকের নিয়োগ প্রক্রিয়া, বিদ্যালয়ের আর্থিক লেনদেন, ক্যাশবুক, ব্যাংক হিসাব, অডিট প্রতিবেদন এবং সম্পদের উৎস তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, অভিযোগটি তাঁর দপ্তরে পৌঁছেছে এবং ইতোমধ্যে একজন তদন্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মো. গিয়াস উদ্দিনের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, আবেদনপত্রে উত্থাপিত অভিযোগগুলো অভিযোগকারীদের দাবি মাত্র। এখন পর্যন্ত কোনো তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত শেষে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।