
– প্রফেসার ড. আসিফ মিজান, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক এবং উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের নজিরবিহীন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে যে নতুন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বন্দোবস্তের (Constitutional Settlement) সূচনা হয়েছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক সুদূরপ্রসারী রূপান্তর তৈরি করেছে। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় একচ্ছত্র অধিপত্য বিস্তারের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যেমন নতুন পারদ যুক্ত করেছে, তেমনি তা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর কূটনৈতিক দাবার ঘুঁটিকেও নতুন করে আলোড়িত করছে। একজন অপরাধ বিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক হিসেবে এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি অপরাধতাত্ত্বিক বিচারিক জবাবদিহিতা (Criminological Accountability) এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাবাদের (Geopolitical Realism) এক অত্যন্ত জটিল সংমিশ্রণ।
ওএইচসিএইচআর (OHCHR) রিপোর্ট, গুমের কমিশন এবং বিচারিক চ্যালেঞ্জঃ
শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাধা হলো তাঁর বিরুদ্ধে দেশে চলমান অসংখ্য ফৌজদারি মামলা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) সহ দেশের বিভিন্ন আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গণ-অভ্যুত্থানকালীন সহিংসতার অভিযোগে যেসব মামলা রুজু হয়েছে, তা অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় ‘Macro-level State-sponsored Crimes’ বা রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট অপরাধের আওতাভুক্ত।
এখানে তিনটি প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি দেয়াল অত্যন্ত দৃশ্যমান:
জাতিসংঘের অকাট্য ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট:
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের (OHCHR) স্বাধীন তদন্ত দল তাদের সাম্প্রতিক চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করেছে যে, শেখ হাসিনার শাসনামলে এবং বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও तत्कालीन ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডার বাহিনী সুপদ্ধতিগতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্যাতন ও খেয়ালখুশি মতো হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। ওএইচসিএইচআর (OHCHR)-এর রিপোর্টে এগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে গুরুতর অপরাধ বা ‘Crimes under international law’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
গুমের কমিশনের চেইন অব কমান্ড:
সরকারের বিশেষ ‘কমিশন অব ইনকোয়ারি অন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’-এর তদন্তে শেখ হাসিনার শাসনামলে আয়নাঘরসহ বিভিন্ন গোপন বন্দিশালায় হাজারো নাগরিককে গুম করার প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত নকশা উন্মোচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন অনুযায়ী, এটি সরাসরি তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানের ওপর ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ (Command Responsibility) বা দায়ভার চাপায়, যা তাঁর প্রত্যাবর্তনকে আইনি ফাঁসির কাষ্ঠে দাঁড় করানোর সমতুল্য।
প্রত্যর্পণ চুক্তি ও ভারতের আইনি বাধ্যবাধকতা:
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty) কার্যকর রয়েছে, যা ২০১৬ সালে আরও পরিমার্জন করা হয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, রাজনৈতিক অপরাধের (Political Offenses) ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ প্রযোজ্য না হলেও, নরহত্যা, গুম বা মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে এই ছাড় পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফলে, শেখ হাসিনা যদি স্বেচ্ছায় ফিরে না আসেন, তবে জাতিসংঘের এই অকাট্য রিপোর্ট এবং গুমের কমিশনের তথ্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করে তাঁকে আইনিভাবে হস্তান্তরের দাবি বর্তমান সরকারের জন্য একটি অত্যন্ত শক্ত আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি প্রদান করছে।
টিআইবি’র পর্যবেক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতাঃ
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) তাদের সাম্প্রতিক সুশাসন ও রাষ্ট্র সংস্কার বিষয়ক policy paper-এ স্পষ্ট করেছে যে, বাংলাদেশে টেকসই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিগত এক দশকের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিচার নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। টিআইবি’র মতে, বিচারহীনতার যে দীর্ঘস্থায়ী সংস্কৃতি দেশে জেঁকে বসেছিল, তা ভাঙার জন্য এই বিচারিক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হতে হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তন তাই কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা (Judicial Credibility) পুনর্গঠনের এক লিটমাস টেস্ট।
সোশ্যাল মিডিয়ার জনমত: মনস্তাত্ত্বিক মেরুকরণ ও ডিজিটাল রেটোরিকঃ
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যে তুমুল ট্রেন্ড তৈরি হয়েছে, তা সমকালীন জনমনস্তত্ত্বের (Public Psychology) এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। অপরাধমনস্তত্ত্ব (Criminological Psychology) এবং কালেক্টিভ বিহেভিয়ার (Collective Behavior) তত্ত্বের আলোকে এই ডিজিটাল প্রবণতাকে দুটি সমান্তরাল ধারায় ভাগ করা যায়:
আগ্রাসী ট্রমা এবং বিচারহীনতার ভীতি (Aggressive Trauma & Fear of Impunity):
নেটিজেনদের একটি বিশাল অংশের মধ্যে এই ঘোষণা তীব্র ক্ষোভ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষার (Psychological Defense Mechanism) জন্ম দিয়েছে। জুলাই-আগস্টের রাজপথের সহিংসতার ট্রমা এখনও কাটিয়ে উঠতে না পারা সাধারণ মানুষ ও তরুণ প্রজন্মের কাছে এই প্রত্যাবর্তন এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক হুমকি। ডিজিটাল স্পেসে তাদের প্রতিক্রিয়াগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা একে ‘বিপ্লব নস্যাৎ’ এবং পূর্বের ‘ফ্যাসিবাদী কাঠামোর’ পুনর্বাসনের অপচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। ফলস্বরূপ, মব জাস্টিস বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এক অবদমিত ও বিপজ্জনক মনস্তাত্ত্বিক আকুলতা (Vigilante Psychology) নেটিজেনদের একাংশের বয়ানে প্রতিফলিত হচ্ছে, যা রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক নস্টালজিয়া ও সাইবার প্রোপাগান্ডা (Political Nostalgia & Cyber Propaganda):
বিপরীত কোণ থেকে, ক্ষমতাচ্যুত দলের সাইবার উইং এবং একনিষ্ঠ সমর্থকদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টগুলোতে একটি সুপরিকল্পিত ‘নস্টালজিয়া’ এবং ‘উদ্ধারকর্তা’ ইমেজের মনস্তাত্ত্বিক খেলা (Perception Warfare) দৃশ্যমান। অন্তর্বর্তীকালীন বা নতুন সরকারের মেয়াদের বাজারমূল্য বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাময়িক অবনতি বা মব ভায়োলেন্সকে পুঁজি করে তারা ডিজিটাল স্পেসে ‘উন্নয়ন বনাম বিশৃঙ্খলা’-র একটি বাইনারি বয়ান তৈরি করছে। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘Techniques of Neutralization’, যেখানে অতীত অপরাধগুলোকে বর্তমানের সংকটের আড়ালে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সোশ্যাল মিডিয়ার এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ মূলত মাঠের রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করার একটি ডিজিটাল মহড়া।
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ: ভারত ও চীনের কৌশলগত উভয়সংকট (Dilemma)ঃ
শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা এবং সরকারের কূটনৈতিক অবস্থানকে ত্রিমাত্রিক কোণ থেকে বিশ্লেষণ করতে হবে—ঢাকা, নয়া দিল্লি এবং বেইজিং।
ক) ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ ও ‘কৌশলগত শূন্যতা’ঃ
নয়া দিল্লির জন্য শেখ হাসিনা ছিলেন তাদের পূর্ব সীমান্তে দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও অনুগত কৌশলগত অংশীদার। তাঁর পতনের পর ভারত বাংলাদেশে এক ধরনের ‘কৌশলগত শূন্যতা’ (Strategic Vacuum) অনুভব করছে। নয়া দিল্লি যদি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়, তবে তা তাদের অন্যান্য আঞ্চলিক মিত্রদের কাছে একটি নেতিবাচক বার্তা দেবে যে, চরম সংকটে ভারত তার বন্ধুদের পাশে থাকে না। বিপরীতভাবে, তাঁকে দীর্ঘকাল আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান কাঠামোর সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক না করলে বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হতে পারে, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (Seven Sisters) নিরাপত্তার জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
খ) চীনের বাস্তববাদী কূটনীতি (Pragmatic Diplomacy)ঃ
বেইজিংয়ের পররাষ্ট্রনীতি সবসময়ই মতাদর্শের চেয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবকে অগ্রাধিকার দেয়। শেখ হাসিনার শাসনামলে চীন বাংলাদেশে বিপুল বিনিয়োগ করেছিল। তবে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বেইজিং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছে এবং নতুন নেতৃত্বের সাথে সম্পর্ক জোরদারে মনস্তাত্ত্বিক নীতি গ্রহণ করেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সচল রাখতে এবং মেগা প্রজেক্টগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষায় চীনের সস্তা ঋণ ও বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর বাজি না ধরে বরং রাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, যাতে বঙ্গোপসাগরে তাদের প্রবেশাধিকার (Indo-Pacific টেনশনের প্রেক্ষাপটে) অক্ষুণ্ণ থাকে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশলগত অবস্থান ও ‘ফ্লেক্সিবল রিয়েলিজম’ঃ
দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অবস্থান এই সমীকরণে একটি নতুন ও অত্যন্ত শক্তিশালী বৈশ্বিক মাত্রা যোগ করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনের অধীনে ঘোষিত নতুন ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি’ (NSS) এবং ‘ফ্লেক্সিবল রিয়েলিজম’ (Flexible Realism)-এর নীতি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে তার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে আরও আগ্রাসী রূপ দিয়েছে।
চীনের সামরিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাব ঠেকানোর নীতি:
বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাব (যেমন ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র বা সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ) নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফরে এসে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশ যাতে চীনের ওপর সামরিক ও অবকাঠামোগতভাবে অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বিকল্প উন্নত ডিফেন্স সিস্টেম ও লজিস্টিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
বাণিজ্যিক চুক্তি ও সার্বভৌমত্বের টানাপোড়েন:
২০২৬ সালের শুরুতে সম্পাদিত ‘ইউএস-বাংলাদেশ রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ (ART) এর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বন্দর অবকাঠামো এবং প্রযুক্তি বাজারে তার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেছে। মার্কিন এই কৌশল বাংলাদেশকে এক ধরনের ‘Strategic Choice’ বা পক্ষ নির্বাচনে বাধ্য করছে। ওয়াশিংটন চায় বর্তমান বা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ সরকার যেন মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক অক্ষের বাইরে না যায়। মার্কিন প্রশাসন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং জাতিসংঘের রিপোর্টের ভিত্তিতে শেখ হাসিনার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পক্ষে পরোক্ষ বৈশ্বিক চাপ বজায় রাখছে, যা তাঁর প্রত্যাবর্তনকে কূটনীতিক কোণ থেকে আরও জটিল করে তুলবে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার ভূমিকাঃ
রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতির এই টানাপোড়েন সরাসরি দেশের অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক আউটলুকে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক রূপান্তরের পরবর্তী সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক খাতের সংস্কারের গতি মন্থর হলে তা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ (USTR) কর্তৃক শুল্ক আরোপের নতুন হুঁশিয়ারি ও বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আর্থিক খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিংয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের মতো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার উপাদান যদি অর্থনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করে, তবে তা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অতএব, শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণাটি কেবলই একটি প্রত্যাবর্তনের বার্তা নয়, এটি মূলত বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামোর গভীরতা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা পরিমাপের একটি ভূ-রাজনৈতিক চাল। অপরাধবিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুযায়ী, ওএইচসিএইচআর (OHCHR) এবং জাতীয় তদন্ত কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব; কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তববাদে (Realpolitik) অনেক সময়ই আইনি আদর্শ ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে মার খেয়ে যায়।
অতএব, বাংলাদেশকে যদি এই সংকটের সফল উত্তরণ ঘটাতে হয়, তবে একদিকে যেমন আইসিটি (ICT) ও টিআইবি’র মানদণ্ড অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে ভারত ও চীনের দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ, সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্ফোরক জনমনস্তত্ত্ব এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের ভারসাম্যকে মাথায় রেখে অত্যন্ত চতুর ও পরিপক্ব কূটনীতির (Sophisticated Diplomacy) পরিচয় দিতে হবে। অন্যথায়, এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সাইবার ও বাস্তব ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
লেখকঃ – প্রফেসার ড. আসিফ মিজান, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক এবং উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া।
Reporter Name 

















