
নিজস্ব সংবাদদাতা:- মিসেস আকলিমা আক্তার
উপকূলীয় জনপদ খুলনার কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলায় চিংড়ি চাষকে কেন্দ্র করে আবারও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ও সরকারি রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী কিছু চিংড়ি ঘের মালিক অবৈধভাবে বাঁধ কেটে, পাইপ বসিয়ে এবং নদী থেকে জোয়ারের নোনা পানি প্রবেশ করিয়ে ঘেরে পানি তুলছেন। এতে সরকারি কেয়ার রাস্তা, ওয়াপদা বাঁধ ও উপকূলীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর বর্ষা, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের সময় দুর্বল হয়ে পড়া এসব বাঁধ ভেঙে লোকালয় প্লাবিত হয়। এতে হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে এবং কৃষিজমি, মাছের ঘের ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়।
জানা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণের জন্য নদী ও খাল থেকে নোনা পানি প্রবেশ করাতে অনেক ঘের মালিক পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধে অবৈধ সংযোগ স্থাপন করেছেন। কোথাও বাঁধ কেটে বড় পাইপ বসানো হয়েছে, আবার কোথাও জোয়ার-ভাটার পানির প্রবল চাপে সরকারি রাস্তার পাশ ধসে পড়ছে। এতে সাধারণ মানুষের চলাচলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষ করে কয়রার মহারাজপুর, উত্তর বেদকাশী, দক্ষিণ বেদকাশী, আমাদী এবং পাইকগাছার লতা, গড়ইখালী, দেলুটি, সোলাদানা ও চাঁদখালী ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে এ অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় বছরের পর বছর এসব অনিয়ম চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
উপকূলবাসীরা স্মরণ করেন, ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, আম্পান ও সর্বশেষ রেমালের সময় দুর্বল বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ে এসব এলাকা। অনেক স্থানে নদীর লোনা পানি লোকালয়ে ঢুকে হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। নষ্ট হয়ে যায় ফসলি জমি, মিঠা পানির পুকুর ও টিউবওয়েল। দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানি জমে থাকায় কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ে।
২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আম্পানে কয়রা ও পাইকগাছার বহু স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে কয়েক মাস পানিবন্দি ছিল হাজারো পরিবার। একইভাবে ২০২৪ সালের ঘূর্ণিঝড় রেমালের সময়ও উপকূলীয় অনেক দুর্বল বাঁধে ফাটল ও ভাঙন দেখা দেয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, যেসব স্থানে অবৈধ পাইপ বসানো হয়েছিল বা বাঁধ কাটা হয়েছিল, সেসব এলাকাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সোলাদানার বাসিন্দা মো. রবিউল ইসলাম বলেন,
“চিংড়ি ঘেরের জন্য যারা বাঁধ কাটছে তারা শুধু নিজেদের লাভ দেখছে। কিন্তু বাঁধ ভেঙে গেলে পুরো এলাকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা প্রতি বছর আতঙ্ক নিয়ে জীবনযাপন করি।”
লতা গ্রামের বাসিন্দা শিউলী বেগম বলেন,
“জোয়ার এলেই ভয় লাগে কখন বাঁধ ভেঙে যায়। আইলা আর আম্পানের সময় আমাদের ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। এখনো সেই ভয় কাটেনি।”
কয়রার কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান,
“নোনা পানি ঢুকে আমাদের জমির ধান নষ্ট হয়ে যায়। মিঠা পানির সংকট তৈরি হয়। কিন্তু যারা বাঁধ কাটে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা হয় না।”
উপকূল রক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ, অবৈধভাবে নোনা পানি প্রবেশ করানো এবং বাঁধের পাশে অতিরিক্ত পানির চাপ সৃষ্টি হওয়ায় উপকূলীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ছে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও বাড়ছে। দ্রুত নজরদারি, নিয়মিত সংস্কার এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা রাজু আহমেদ বলেন,
“সরকারি বাঁধ ও রাস্তা কেটে বা ক্ষতিগ্রস্ত করে কেউ চিংড়ি চাষ করতে পারে না। কিছু অসাধু জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ঘের মালিক রাতের আঁধারে নদী থেকে নোনা পানি উত্তোলনের সুযোগ করে দেন। বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন,
“বাঁধে অবৈধ পাইপ স্থাপন ও কাটার ঘটনায় অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপকূলীয় বাঁধ সুরক্ষায় নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে।”
এদিকে পাইকগাছাস্থ মানবাধিকার উন্নয়ন কেন্দ্রের পরিচালক জানান, পৌর এলাকায় নোনা পানি উত্তোলন বন্ধে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হলেও বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
উপকূলীয় জনগণের দাবি, চিংড়ি চাষের নামে বেড়িবাঁধ ও সরকারি রাস্তা ধ্বংসের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক অভিযান পরিচালনা, অবৈধ পাইপ অপসারণ এবং টেকসই উপকূল সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
ছবি: পূর্বে কয়রা ও পাইকগাছার ওয়াপদা বাঁধ ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার দৃশ্য।
মিসেস আকলিমা আক্তার 











