Dhaka 7:47 pm, Thursday, 25 June 2026

কৃষকদের মাঝে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি ও গ্রাহকদের সম্পৃক্ততায় ব্যতিক্রমী কৃষি বাজার

রহমত আরিফ, ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা:

 

কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো এবং নিরাপদ খাদ্য সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনব্যাপী এক ব্যতিক্রমী কৃষক বাজার। এ আয়োজন কৃষকদের মাঝে নতুন উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে এবং স্থানীয় গ্রাহকদের কাছেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর অর্থায়নে এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইএসডিও (ESDO)-এর বাস্তবায়নে বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আরাজি চন্ডিপুর গ্রামে এ কৃষক বাজারের উদ্বোধন করা হয়। দিনব্যাপী চলা এই বাজারে স্থানীয় কৃষকরা নিজেদের উৎপাদিত তাজা ও নিরাপদ কৃষিপণ্য নিয়ে অংশগ্রহণ করেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাজারটিতে কৃষকরা তাদের নিজস্ব ক্ষেতের উৎপাদিত বিষমুক্ত ও অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ করা শাকসবজি, গরুর দুধ, পুকুরের মাছ, কলা, আম, কাঁঠাল, নিজস্ব বরজের পানসহ নানা ধরনের কৃষিপণ্য নিয়ে দোকান সাজিয়ে বসেছেন। অন্যদিকে স্থানীয় ক্রেতারাও সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে টাটকা ও নিরাপদ খাদ্যপণ্য কিনতে ভিড় করেন।

ক্রেতারা জানান, বাজারে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য কিনতে পারায় তারা তুলনামূলক কম দামে ভালো মানের পণ্য পাচ্ছেন। একই সঙ্গে পণ্যের উৎপাদন পদ্ধতি ও গুণগত মান সম্পর্কেও সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে তথ্য জানতে পারছেন। এতে একদিকে যেমন ভোক্তাদের আস্থা বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষকরাও তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন।

অংশগ্রহণকারী কৃষকদের ভাষ্য, সাধারণত বাজারে বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়াদের কারণে তারা উৎপাদিত পণ্যের সঠিক দাম পান না। কিন্তু কৃষক বাজারে সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পণ্য বিক্রির সুযোগ পাওয়ায় তারা বেশি লাভবান হচ্ছেন। এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত হলে কৃষকরা আরও বেশি করে নিরাপদ ও অর্গানিক পণ্য উৎপাদনে আগ্রহী হবেন বলে তারা মনে করেন।

আয়োজকরা জানান, কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করাই এ কৃষক বাজারের মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমিয়ে কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা (ডিএই) বাবু নিহার রঞ্জন রায়, পূর্ব আরাজি চন্ডিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি রোকন উদ্দিন, প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ রইস উদ্দিন সাজু, বাজার কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ জজ মিয়া, ইএসডিও’র হেড অব প্রোগ্রাম (এগ্রিকালচার) কৃষিবিদ বাবুল বনিক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, কৃষক প্রতিনিধি এবং ইএসডিও’র বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মকর্তাবৃন্দ।

বক্তারা বলেন, কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করতে এবং নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এ ধরনের কৃষক বাজার সময়োপযোগী ও কার্যকর উদ্যোগ। ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে একটি টেকসই সেতুবন্ধন তৈরি করা সম্ভব হবে।

স্থানীয়দের মতে, এই ব্যতিক্রমী কৃষক বাজার শুধু পণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রই নয়, বরং কৃষকদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। ফলে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ঘনঘন লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে মৌচাকে বিক্ষোভ পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও ও স্মারকলিপি প্রদান

কৃষকদের মাঝে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি ও গ্রাহকদের সম্পৃক্ততায় ব্যতিক্রমী কৃষি বাজার

Update Time : 04:56:35 pm, Thursday, 25 June 2026

রহমত আরিফ, ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা:

 

কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো এবং নিরাপদ খাদ্য সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনব্যাপী এক ব্যতিক্রমী কৃষক বাজার। এ আয়োজন কৃষকদের মাঝে নতুন উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে এবং স্থানীয় গ্রাহকদের কাছেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর অর্থায়নে এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইএসডিও (ESDO)-এর বাস্তবায়নে বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আরাজি চন্ডিপুর গ্রামে এ কৃষক বাজারের উদ্বোধন করা হয়। দিনব্যাপী চলা এই বাজারে স্থানীয় কৃষকরা নিজেদের উৎপাদিত তাজা ও নিরাপদ কৃষিপণ্য নিয়ে অংশগ্রহণ করেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাজারটিতে কৃষকরা তাদের নিজস্ব ক্ষেতের উৎপাদিত বিষমুক্ত ও অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ করা শাকসবজি, গরুর দুধ, পুকুরের মাছ, কলা, আম, কাঁঠাল, নিজস্ব বরজের পানসহ নানা ধরনের কৃষিপণ্য নিয়ে দোকান সাজিয়ে বসেছেন। অন্যদিকে স্থানীয় ক্রেতারাও সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে টাটকা ও নিরাপদ খাদ্যপণ্য কিনতে ভিড় করেন।

ক্রেতারা জানান, বাজারে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য কিনতে পারায় তারা তুলনামূলক কম দামে ভালো মানের পণ্য পাচ্ছেন। একই সঙ্গে পণ্যের উৎপাদন পদ্ধতি ও গুণগত মান সম্পর্কেও সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে তথ্য জানতে পারছেন। এতে একদিকে যেমন ভোক্তাদের আস্থা বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষকরাও তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন।

অংশগ্রহণকারী কৃষকদের ভাষ্য, সাধারণত বাজারে বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়াদের কারণে তারা উৎপাদিত পণ্যের সঠিক দাম পান না। কিন্তু কৃষক বাজারে সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পণ্য বিক্রির সুযোগ পাওয়ায় তারা বেশি লাভবান হচ্ছেন। এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত হলে কৃষকরা আরও বেশি করে নিরাপদ ও অর্গানিক পণ্য উৎপাদনে আগ্রহী হবেন বলে তারা মনে করেন।

আয়োজকরা জানান, কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করাই এ কৃষক বাজারের মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমিয়ে কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা (ডিএই) বাবু নিহার রঞ্জন রায়, পূর্ব আরাজি চন্ডিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি রোকন উদ্দিন, প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ রইস উদ্দিন সাজু, বাজার কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ জজ মিয়া, ইএসডিও’র হেড অব প্রোগ্রাম (এগ্রিকালচার) কৃষিবিদ বাবুল বনিক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, কৃষক প্রতিনিধি এবং ইএসডিও’র বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মকর্তাবৃন্দ।

বক্তারা বলেন, কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করতে এবং নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এ ধরনের কৃষক বাজার সময়োপযোগী ও কার্যকর উদ্যোগ। ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে একটি টেকসই সেতুবন্ধন তৈরি করা সম্ভব হবে।

স্থানীয়দের মতে, এই ব্যতিক্রমী কৃষক বাজার শুধু পণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রই নয়, বরং কৃষকদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। ফলে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই।