
মোঃ আকাব্বর হোসাইন রবীন,নিজস্ব প্রতিনিধি:
জীবিকার সন্ধানে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে সুদূর রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার যুবক মাফল। পরিবারের দাবি, রাজমিস্ত্রির কাজের আশ্বাস দিয়ে একটি এজেন্সির মাধ্যমে তাকে রাশিয়ায় পাঠানো হলেও সেখানে পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুত চাকরি না দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। অবশেষে ড্রোন হামলায় তার মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছালে পরিবার ও এলাকাজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া।
নিহত মাফল মাদারগঞ্জ উপজেলার ২ নম্বর কড়ইচড়া ইউনিয়নের চর গুজামানিকা গ্রামের বানু মিয়ার ছেলে। মাত্র এক মাস ১২ দিন আগে তিনি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে রাশিয়ায় যান। পরিবারের সদস্যরা জানান, বিদেশে যাওয়ার আগে তাকে বলা হয়েছিল যে সেখানে নির্মাণ শ্রমিক ও রাজমিস্ত্রির কাজ রয়েছে। উন্নত আয়ের আশায় ধারদেনা করে বিদেশ যাত্রার ব্যবস্থা করেন তিনি।
স্বজনদের অভিযোগ, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পরই মাফল বুঝতে পারেন বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাকে কোনো নির্মাণকাজে নিয়োগ না দিয়ে সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন একটি ক্যাম্পে রাখা হয়। পরবর্তীতে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয় বলে তিনি পরিবারের সদস্যদের ফোনে জানিয়েছিলেন।
পরিবারের ভাষ্যমতে, বিদেশে যাওয়ার পর কয়েকবার ফোনে যোগাযোগ করে মাফল জানান, তিনি নিরাপদ অবস্থায় নেই এবং তাকে যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো হতে পারে। সে সময় তিনি পরিবারের সদস্যদের কাছে দোয়া চান এবং দেশে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষার কথাও জানান।
গত ২৯ মে থেকে মাফলের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘদিন কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বেগে দিন কাটাতে থাকে পরিবার। অবশেষে রোববার (১৪ জুন) তারা জানতে পারেন, রাশিয়ায় ড্রোন হামলায় মাফল নিহত হয়েছেন।
নিহতের চাচা আনিস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার ভাতিজা যুদ্ধ করতে রাশিয়া যায়নি। সে গিয়েছিল রাজমিস্ত্রির কাজ করতে। এজেন্সি তাকে প্রতারণা করে সেখানে পাঠিয়েছে। পরে আমরা জানতে পারি, তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। এটি অত্যন্ত মানবিক ও ভয়াবহ একটি ঘটনা।”
তিনি আরও বলেন, “সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, যারা এ ধরনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষকে বিদেশে পাঠায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে আমার ভাতিজার মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক।”
নিহতের ভাই আশরাফুল ইসলাম বলেন, “আমার ভাই সংসারের হাল ধরতে বিদেশে গিয়েছিল। আমরা কখনো ভাবিনি সে এভাবে মৃত্যুবরণ করবে। সরকারের সহযোগিতায় আমরা তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে চাই। পাশাপাশি যারা তাকে ভুল তথ্য দিয়ে বিদেশে পাঠিয়েছে, তাদের বিচার চাই।”
মাফলের বোন আছিয়া জানান, তার ভাই একা নন, আরও প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশি একই সময়ে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। তাদের অনেককেই সামরিক ক্যাম্পে নেওয়া হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “আমার ভাইয়ের মতো আরও অনেকে বিপদের মধ্যে থাকতে পারেন। সরকার যেন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে।”
এ ঘটনায় স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণা করে সাধারণ মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া একটি গুরুতর অপরাধ। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দালাল ও সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
এ বিষয়ে মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হবে।”
পরিবারের সদস্যরা সরকারের কাছে মাফলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে যে এজেন্সির মাধ্যমে তাকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল, তাদের কার্যক্রম তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণার ফাঁদে পড়ে যাতে আর কোনো বাংলাদেশি প্রাণ হারাতে না হয়, সে জন্য সরকার, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মাফলের মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে না থাকে, বরং এটি প্রতারণার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের একটি সতর্কবার্তা হয়ে উঠুক—এমনটাই প্রত্যাশা স্বজন ও এলাকাবাসীর।
মোঃ আকাব্বর হোসাইন রবীন 


















