
নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৪ জুলাই ২০২৬
কলকাতা বিমানবন্দরের অতি সুরক্ষিত এলাকা বা ‘হাই-সিকিউরিটি জোন’-এর অভ্যন্তরে অবস্থিত ১৩৬ বছরের পুরোনো একটি মসজিদকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। বিমানবন্দরের রানওয়ের সন্নিকটে অবস্থিত এই মসজিদটিতে নামাজ পড়া নিয়ে বিধিনিষেধ আরোপ এবং পরবর্তীতে তা সরিয়ে ফেলার সরকারি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
বিতর্কের সূত্রপাত ও বর্তমান পরিস্থিতি
প্রাথমিকভাবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, মসজিদে যাতায়াতের রাস্তার সংস্কার কাজের জন্য সাময়িকভাবে নামাজ পড়া বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে পরবর্তীতে সুরক্ষাজনিত কারণ দেখিয়ে কর্তৃপক্ষ এই নিষেধাজ্ঞা অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দেয়। ব্যুরো অফ সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি (বিসিএএস)-এর পক্ষ থেকেও এই মসজিদের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে বলে সূত্র মারফত জানা গেছে।
রাজনৈতিক অবস্থান
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মেচেদায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেছেন, “আমরা কাউকেই ধর্ম পালনে বাধা দিচ্ছি না। কিন্তু কলকাতা বিমানবন্দর একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। জাতীয় নিরাপত্তা ও যাত্রী সুরক্ষার খাতিরে এভাবে বিমানবন্দর চত্বরে মসজিদ চালু রাখা সম্ভব নয়।”
তবে এই ইস্যুতে রাজনৈতিক মেরুকরণ স্পষ্ট। বিজেপির মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ সরাসরি দাবি করেছেন, “সরকারি জমিতে কোনো ধর্মীয় উপাসনালয় থাকতে পারে না।” অন্যদিকে, প্রাক্তন মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী এই সিদ্ধান্তকে ‘গায়ের জোর’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, গত ১৩৬ বছর ধরে এই মসজিদটি কোনো ধরনের শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণ হয়নি, এমনকি নামাজ পড়তে আসা ব্যক্তিদের চলাচলের ওপরও কড়া নজরদারি থাকত।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জনমত
‘বাঁকরা মসজিদ’ বা ‘গৌরীপুর জামা মসজিদ’ নামে পরিচিত এই স্থাপত্যটি বিমানবন্দরের আধুনিক সম্প্রসারণের চেয়েও প্রাচীন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ১৮৭০ সাল থেকেই এখানে নিয়মিত নামাজ পড়া হয়। ১৯৫০ সালে বিমানবন্দর সম্প্রসারণের সময় স্থানীয় গ্রামগুলো স্থানান্তর করা হলেও মসজিদটি স্বমহিমায় টিকে ছিল। এতদিন পর্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা যাচাইয়ের মাধ্যমে নামাজিরা নির্দিষ্ট বাসে করে মসজিদে যাতায়াত করতেন।
বিজেপি নেতা রাহুল সিনহা এবং রুদ্রনীল ঘোষের মতে, উন্নয়নের প্রয়োজনে এবং বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ অপরিহার্য। তাঁদের দাবি, মসজিদের পরিবর্তে যদি অন্য কোনো ধর্মস্থানও বিমানবন্দরের সুরক্ষাবলয়ে বাধা সৃষ্টি করত, তবে একইভাবে তা সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হতো।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
এদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী সাংসদ বাবুল সুপ্রিয় মনে করেন, বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ এখতিয়ার একমাত্র ‘এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া’-র।
বর্তমানে মসজিদটিতে প্রবেশাধিকার বন্ধ থাকায় স্থানীয় মুসল্লিদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। নিরাপত্তা এবং ঐতিহ্যের এই টানাপোড়েনের মাঝে মসজিদটি শেষ পর্যন্ত সরানো হয় কি না, তা এখন দেখার বিষয়।
Reporter Name 



















