Dhaka 10:40 am, Sunday, 5 July 2026

আল-আজহারের প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ড. আহমদ ওমর হাশেম আর নেই

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান:

বিশ্ব ইসলামি চিন্তা ও জ্ঞানচর্চার আকাশ থেকে ঝরে পড়ল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের উসূলুদ্দিন অনুষদের বরেণ্য অধ্যাপক, হাদিস বিভাগের প্রখ্যাত পণ্ডিত, আল-আজহার শরীফের সিনিয়র স্কলারস কাউন্সিলের সদস্য এবং প্রাক্তন উকিলুল আজহার ড. আহমদ ওমর হাশেম আর নেই। তাঁর মৃত্যুতে পুরো ইসলামি দুনিয়ায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

ড. আহমদ ওমর হাশেম ছিলেন এই যুগের এক মহীরুহ আলেম—হাদিস, তাফসির, আকিদা ও দাওয়াতের অঙ্গনে যাঁর অবদান অপরিসীম। সমকালীন সময়ের পণ্ডিতসমাজ তাঁকে সম্মানভরে “আমিরুল ফিল হাদিস”—অর্থাৎ হাদিসবিদ্যার অগ্রগামী নেতা—হিসেবে অভিহিত করতেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে তাঁর অসংখ্য ছাত্র আজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ইসলাম ও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন ছিলেন কঠোর নীতিবান ও নির্ভুল, তেমনি ছাত্রদের প্রতি ছিলেন এক স্নেহময় অভিভাবক। তাঁর বক্তৃতায় পাওয়া যেত জ্ঞানের গভীরতা, বাকপটুতার সৌন্দর্য আর চিন্তার পরিমিতি। তিনি বিশ্বাস করতেন—“ইলম” কখনো কেবল মুখস্থ বিদ্যা নয়, বরং তা আত্মাকে আলোকিত করে, মানবতাকে শুদ্ধ করে।

ড. হাশেমের আজহারীয় দর্শন ছিল মধ্যপন্থা ও সংযমের দৃষ্টান্ত। তিনি বলতেন, ইসলামকে বুঝতে হলে দরকার মুক্ত চিন্তা, ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রমাণের প্রতি আনুগত্য। তাঁর চিন্তা ও বক্তব্যে একদিকে ছিল নববী ঐতিহ্যের গভীর অনুরণন, অন্যদিকে আধুনিক সময়ের সাথে ইসলামী জ্ঞানের বাস্তব সংলাপ।

দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেন, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তৃতা দেন এবং ইসলামি ঐক্য, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের বার্তা প্রচার করেন। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে তিনি শিক্ষা ও নৈতিকতার এক আদর্শ পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।

তাঁর মৃত্যুর খবরে আল-আজহার শরীফসহ সমগ্র মিশরে শোকের ঢেউ বয়ে গেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওলামায়ে কেরাম, ইসলামী চিন্তাবিদ, প্রাক্তন ছাত্র ও ধর্মপ্রাণ মানুষ সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করে শ্রদ্ধা ও দোয়া জানিয়েছেন।

বিশ্ববাসী আজ হারালেন এক সত্যিকারের আলেমে দ্বীন, যিনি সারা জীবন ব্যয় করেছেন কুরআন ও হাদিসের আলো মানুষের হৃদয়ে ছড়িয়ে দিতে।

মহান আল্লাহ তায়ালা ড. আহমদ ওমর হাশেমকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন এবং তাঁর রেখে যাওয়া জ্ঞান, দাওয়াত ও খেদমত থেকে মুসলিম উম্মাহকে যুগ যুগ ধরে উপকৃত হওয়ার তাওফিক দিন।

লেখক ও কলামিস্ট, শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কয়রো,মিশর

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও জনবলের সংকট সাধারণ রোগীদের চরম ভোগান্তি। মোঃ শাহ্ আলম সরকার স্টাফ রিপোর্টার। গাজীপুর কালিয়াকৈর উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও জনবলের দীর্ঘদিনের নানা সংকট, হসপিটালে জেনারেটর না থাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় জরুরি চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হওয়া এক দালালচক্রের তৎপরতায় সাধারণ রোগীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন প্রতিদিন কয়েকশ রোগী চিকিৎসা সেবা নিতে এলেও সীমিত জনবল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধার অভাবে কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না বলে অভিযোগ করেছেন দূর দূরান্ত থেকে আসা রোগী ও স্বজনরা। ২ জুলাই রোজ বৃহস্পতিবার হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, বহির্বিভাগে সকাল থেকেই রোগীদের দীর্ঘ সারি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রোগীরা একজন চিকিৎসককে একাধিক বিভাগের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। শিশু, বয়স্ক ও নারী রোগীদের অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসকের সাক্ষাৎ মিলেনা। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৫০ শয্যার এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদের মধ্যে বর্তমানে ১০টি পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং চতুর্থ শ্রেণির প্রায় ৫০ শতাংশ পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি রয়েছে। ফলে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অভাব। হাসপাতালে কোনো জেনারেটর না থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে জরুরি বিভাগ, নেবুলাইজার, অক্সিজেন সাপোর্টসহ বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়। অনেক সময় রোগীর স্বজনদের হাতপাখা দিয়ে রোগীদের বাতাস করতে দেখা যায়। এতে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়। রেহেনা আক্তার নামের এক রোগী বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসক পাওয়া যায় না। পরে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়। এতে আমাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল বাসেত বলেন, এত বড় উপজেলার একমাত্র সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক ও জনবল সংকট দীর্ঘদিনের। দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ একটি জেনারেটর স্থাপন করা না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। এদিকে হাসপাতালকে দালালমুক্ত রাখতে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ১ জুলাই থেকে হাসপাতালের ১০ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কোনো দালালের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ.এইচ.এম. ফখরুল হোসেন বলেন, কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক, জনবল ও জেনারেটর সংকটের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। শূন্য পদ পূরণ জেনারেটর বরাদ্দের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জরুরি ভিত্তিতে চিঠি পাঠানো হবে। হাসপাতালের সেবায় কোনো ধরনের অনিয়ম, দালালচক্রের তৎপরতা বরদাশত করা হবে না। ইতোমধ্যে হাসপাতালের নিরাপত্তা ও দালাল নিয়ন্ত্রণে ১০ জন আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাদিয়া তাসনিম মুনমুন বলেন, চিকিৎসক ও জনবল সংকট সত্ত্বেও সীমিত জনবল নিয়ে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে। শূন্য পদ পূরণ জেনারেটর বরাদ্দের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রয়োজনীয় চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। হাসপাতালকে দালালমুক্ত রাখতে প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা গেছে, প্রতিদিন এ হাসপাতালে জরুরি প্রসূতি সেবা, নবজাতক ও শিশু চিকিৎসা, অক্সিজেন সাপোর্ট, টিকাদান, বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়। কিন্তু জনবল সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেবার মান ধরে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সত্য বলতে কলিজা লাগে কেউ রাগ কইরেন না

আল-আজহারের প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ড. আহমদ ওমর হাশেম আর নেই

Update Time : 01:45:40 pm, Tuesday, 7 October 2025

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান:

বিশ্ব ইসলামি চিন্তা ও জ্ঞানচর্চার আকাশ থেকে ঝরে পড়ল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের উসূলুদ্দিন অনুষদের বরেণ্য অধ্যাপক, হাদিস বিভাগের প্রখ্যাত পণ্ডিত, আল-আজহার শরীফের সিনিয়র স্কলারস কাউন্সিলের সদস্য এবং প্রাক্তন উকিলুল আজহার ড. আহমদ ওমর হাশেম আর নেই। তাঁর মৃত্যুতে পুরো ইসলামি দুনিয়ায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

ড. আহমদ ওমর হাশেম ছিলেন এই যুগের এক মহীরুহ আলেম—হাদিস, তাফসির, আকিদা ও দাওয়াতের অঙ্গনে যাঁর অবদান অপরিসীম। সমকালীন সময়ের পণ্ডিতসমাজ তাঁকে সম্মানভরে “আমিরুল ফিল হাদিস”—অর্থাৎ হাদিসবিদ্যার অগ্রগামী নেতা—হিসেবে অভিহিত করতেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে তাঁর অসংখ্য ছাত্র আজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ইসলাম ও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন ছিলেন কঠোর নীতিবান ও নির্ভুল, তেমনি ছাত্রদের প্রতি ছিলেন এক স্নেহময় অভিভাবক। তাঁর বক্তৃতায় পাওয়া যেত জ্ঞানের গভীরতা, বাকপটুতার সৌন্দর্য আর চিন্তার পরিমিতি। তিনি বিশ্বাস করতেন—“ইলম” কখনো কেবল মুখস্থ বিদ্যা নয়, বরং তা আত্মাকে আলোকিত করে, মানবতাকে শুদ্ধ করে।

ড. হাশেমের আজহারীয় দর্শন ছিল মধ্যপন্থা ও সংযমের দৃষ্টান্ত। তিনি বলতেন, ইসলামকে বুঝতে হলে দরকার মুক্ত চিন্তা, ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রমাণের প্রতি আনুগত্য। তাঁর চিন্তা ও বক্তব্যে একদিকে ছিল নববী ঐতিহ্যের গভীর অনুরণন, অন্যদিকে আধুনিক সময়ের সাথে ইসলামী জ্ঞানের বাস্তব সংলাপ।

দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেন, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তৃতা দেন এবং ইসলামি ঐক্য, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের বার্তা প্রচার করেন। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে তিনি শিক্ষা ও নৈতিকতার এক আদর্শ পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।

তাঁর মৃত্যুর খবরে আল-আজহার শরীফসহ সমগ্র মিশরে শোকের ঢেউ বয়ে গেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওলামায়ে কেরাম, ইসলামী চিন্তাবিদ, প্রাক্তন ছাত্র ও ধর্মপ্রাণ মানুষ সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করে শ্রদ্ধা ও দোয়া জানিয়েছেন।

বিশ্ববাসী আজ হারালেন এক সত্যিকারের আলেমে দ্বীন, যিনি সারা জীবন ব্যয় করেছেন কুরআন ও হাদিসের আলো মানুষের হৃদয়ে ছড়িয়ে দিতে।

মহান আল্লাহ তায়ালা ড. আহমদ ওমর হাশেমকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন এবং তাঁর রেখে যাওয়া জ্ঞান, দাওয়াত ও খেদমত থেকে মুসলিম উম্মাহকে যুগ যুগ ধরে উপকৃত হওয়ার তাওফিক দিন।

লেখক ও কলামিস্ট, শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কয়রো,মিশর