Dhaka 8:53 pm, Thursday, 11 June 2026

পদ্মার চরাঞ্চলে ‘অস্ত্রের রাজত্ব’: চার জেলার সীমান্তে একের পর এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত

পদ্মার চরাঞ্চলে ‘অস্ত্রের রাজত্ব’: চার জেলার সীমান্তে একের পর এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত

মোঃ সোহেল রানা, রাজশাহী বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান:

রাজশাহীর বাঘা, নাটোরের লালপুর, পাবনার ঈশ্বরদী ও কুষ্টিয়ার দৌলতপুর—পদ্মা নদীঘেরা এই চার উপজেলার সীমান্তবর্তী চরাঞ্চল এখন সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। অবৈধ বালুমহাল দখল, নদীপথে চাঁদাবাজি এবং ফসলি জমি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাসে এ এলাকায় একের পর এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার (৯ জুন) বিকেলে নাটোরের লালপুর উপজেলার চরজাজিরা এলাকায় একটি ভাসমান স্পিডবোট থেকে আজিজুল হক ঝড়ু (৩৫) নামে এক যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও রাজশাহীর বাঘা সীমান্তের ‘হবির চর’ এলাকায় কাকন গ্রুপ ও বেলাল গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন বলে জানা গেছে।

স্থানীয়দের দাবি, সন্ত্রাসীরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে চরাঞ্চলে অবস্থান শনাক্ত করে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এর আগে গত কয়েক মাসে চরাঞ্চলে একাধিক ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

বাঘার চরে ডাবল মার্ডার (অক্টোবর):

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার খানপুর চরের প্রায় ৫০০ বিঘা জমি ও ফসল দখলকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ‘কাকন বাহিনী’ এবং বাঘার ‘মনতাজ মণ্ডল গ্রুপ’-এর মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। স্পিডবোটযোগে এসে গুলিবর্ষণের ঘটনায় আমান মণ্ডল ও নাজমুল হক নিহত হন এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনায় একাধিক আসামির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।

ঈশ্বরদীর সাড়াঘাটে হামলা (জুন):

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সাড়া ইউনিয়নের ইসলামপাড়া ও সাড়াঘাট বালুমহাল দখলকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র একটি গ্রুপ স্পিডবোটযোগে হামলা চালায়। এলোপাতাড়ি গুলিতে কৃষিকাজে থাকা সোহান মোল্লা (২৮) গুরুতর আহত হন। স্থানীয় ইজারাদারদের অভিযোগ, বারবার হামলা চালিয়ে বালুমহাল দখলের চেষ্টা চলছে।

হবির চর ও আলাইপুর চরে সংঘর্ষ:

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের হবির চর থেকে রাজশাহীর বাঘার আলাইপুর চর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় একাধিক সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে নিয়মিত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীপথে অবৈধ অস্ত্র এনে এসব হামলা চালানো হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চার জেলার চরাঞ্চলে অন্তত ১১টি সশস্ত্র বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে কাকন বাহিনী, মণ্ডল বাহিনী, বেলাল বাহিনী, টুকু বাহিনী, সাঈদ বাহিনীসহ বেশ কয়েকটি গ্রুপের নাম উঠে এসেছে।

চরবাসীদের অভিযোগ, প্রতিদিনের জীবনে তারা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কৃষকরা নিরাপদে জমিতে যেতে পারছেন না, শ্রমিকরা বালুমহালে কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন।

এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, অতীতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে বহু অপরাধীকে গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে দুর্গম ভূগোলের কারণে অপরাধীরা আবারও সংগঠিত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চরাঞ্চলে চিরুনি অভিযান ও নৌ-পুলিশের টহল জোরদারের পরিকল্পনা চলছে বলেও জানানো হয়েছে। :::

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

খাল পুনরুদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণে চসিকের দুই প্রকল্প, ব্যয় প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা

পদ্মার চরাঞ্চলে ‘অস্ত্রের রাজত্ব’: চার জেলার সীমান্তে একের পর এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত

Update Time : 11:41:57 pm, Wednesday, 10 June 2026

পদ্মার চরাঞ্চলে ‘অস্ত্রের রাজত্ব’: চার জেলার সীমান্তে একের পর এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত

মোঃ সোহেল রানা, রাজশাহী বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান:

রাজশাহীর বাঘা, নাটোরের লালপুর, পাবনার ঈশ্বরদী ও কুষ্টিয়ার দৌলতপুর—পদ্মা নদীঘেরা এই চার উপজেলার সীমান্তবর্তী চরাঞ্চল এখন সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। অবৈধ বালুমহাল দখল, নদীপথে চাঁদাবাজি এবং ফসলি জমি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাসে এ এলাকায় একের পর এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার (৯ জুন) বিকেলে নাটোরের লালপুর উপজেলার চরজাজিরা এলাকায় একটি ভাসমান স্পিডবোট থেকে আজিজুল হক ঝড়ু (৩৫) নামে এক যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও রাজশাহীর বাঘা সীমান্তের ‘হবির চর’ এলাকায় কাকন গ্রুপ ও বেলাল গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন বলে জানা গেছে।

স্থানীয়দের দাবি, সন্ত্রাসীরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে চরাঞ্চলে অবস্থান শনাক্ত করে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এর আগে গত কয়েক মাসে চরাঞ্চলে একাধিক ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

বাঘার চরে ডাবল মার্ডার (অক্টোবর):

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার খানপুর চরের প্রায় ৫০০ বিঘা জমি ও ফসল দখলকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ‘কাকন বাহিনী’ এবং বাঘার ‘মনতাজ মণ্ডল গ্রুপ’-এর মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। স্পিডবোটযোগে এসে গুলিবর্ষণের ঘটনায় আমান মণ্ডল ও নাজমুল হক নিহত হন এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনায় একাধিক আসামির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।

ঈশ্বরদীর সাড়াঘাটে হামলা (জুন):

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সাড়া ইউনিয়নের ইসলামপাড়া ও সাড়াঘাট বালুমহাল দখলকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র একটি গ্রুপ স্পিডবোটযোগে হামলা চালায়। এলোপাতাড়ি গুলিতে কৃষিকাজে থাকা সোহান মোল্লা (২৮) গুরুতর আহত হন। স্থানীয় ইজারাদারদের অভিযোগ, বারবার হামলা চালিয়ে বালুমহাল দখলের চেষ্টা চলছে।

হবির চর ও আলাইপুর চরে সংঘর্ষ:

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের হবির চর থেকে রাজশাহীর বাঘার আলাইপুর চর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় একাধিক সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে নিয়মিত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীপথে অবৈধ অস্ত্র এনে এসব হামলা চালানো হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চার জেলার চরাঞ্চলে অন্তত ১১টি সশস্ত্র বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে কাকন বাহিনী, মণ্ডল বাহিনী, বেলাল বাহিনী, টুকু বাহিনী, সাঈদ বাহিনীসহ বেশ কয়েকটি গ্রুপের নাম উঠে এসেছে।

চরবাসীদের অভিযোগ, প্রতিদিনের জীবনে তারা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কৃষকরা নিরাপদে জমিতে যেতে পারছেন না, শ্রমিকরা বালুমহালে কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন।

এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, অতীতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে বহু অপরাধীকে গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে দুর্গম ভূগোলের কারণে অপরাধীরা আবারও সংগঠিত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চরাঞ্চলে চিরুনি অভিযান ও নৌ-পুলিশের টহল জোরদারের পরিকল্পনা চলছে বলেও জানানো হয়েছে। :::