Dhaka 2:13 am, Wednesday, 29 July 2026

বাংলাদেশের সুপরিচিত ও জনপ্রিয় কবি-সাহিত্যিক মিসেস চামেলি আক্তার প্রিয়া অণুগল্প: স্মৃতির পাতায় আলো

✍️ লিখনীতে: মিসেস চামেলি আক্তার প্রিয়া

বাড়িটার উঠোনে এখন আর বিকেলের কোলাহল নেই। পুরোনো আমগাছটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার ছায়ায় আর কেউ গোল হয়ে বসে গল্প করে না। সময় যেন ধুলো হয়ে জমেছে বারান্দার প্রতিটি ইটে।

বহু বছর পর মিসেস মর্জিনা আক্তার জোৎস্না ফিরে এলেন তাঁর পৈতৃক বাড়িতে। শহরের ব্যস্ত জীবন তাঁকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পর বাড়িটি প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে।

একদিন পুরোনো কাঠের আলমারি গোছাতে গিয়ে তিনি একটি ছোট্ট টিনের বাক্স পেলেন। বাক্সের ভেতরে ছিল কয়েকটি বিবর্ণ ছবি, কিছু পুরোনো চিঠি এবং একটি হারিকেনের কাঁচ।

কাঁচটি হাতে নিয়েই তাঁর মনে পড়ে গেল সেই রাতগুলোর কথা। গ্রামের ঘন অন্ধকারে তখন বিদ্যুৎ থাকত না। বাবা হারিকেন জ্বালিয়ে বলতেন, — “আলো শুধু চোখে নয় মা, মনে জ্বালিয়ে রাখতে হয়।”

সেই আলোয় পড়াশোনা করেই একদিন মর্জিনা আক্তার জোৎস্না বড় হয়েছিলেন, শহরে চাকরি পেয়েছিলেন। কিন্তু সাফল্যের ব্যস্ততায় বাবার সেই কথাগুলো ধীরে ধীরে স্মৃতির আড়ালে হারিয়ে গিয়েছিল।

চিঠিগুলোর একটি খুলতেই বাবার হাতের লেখা চোখে পড়ল—

> “যেদিন আমি থাকব না, সেদিন যদি কখনও একা লাগে, তবে মনে রেখো—মানুষ চলে যায়, কিন্তু ভালোবাসা কখনও বাড়ি ছেড়ে যায় না। স্মৃতিই তখন পথ দেখায়।”

চোখের কোণে অশ্রু টলমল করে উঠল। এত বছর ধরে তিনি ভেবেছিলেন, স্মৃতি শুধু কষ্ট দেয়। কিন্তু সেদিন বুঝলেন—স্মৃতি আসলে অন্ধকারে জ্বলে থাকা একটি প্রদীপ, যার আলো কখনও নিভে যায় না।

পরদিন সকালে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, বাড়িটিকে আর পরিত্যক্ত থাকতে দেবেন না। গ্রামের শিশুদের জন্য গড়ে তুললেন একটি ছোট্ট পাঠাগার। নাম দিলেন “স্মৃতির পাতায় আলো”। বাবার পুরোনো বই, নিজের সংগ্রহ এবং মানুষের দানে ধীরে ধীরে পাঠাগারটি প্রাণ ফিরে পেল।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেখানে একটি হারিকেন জ্বালানো হতো। শিশুরা যখন বই পড়ত, জোৎস্নার মনে হতো—সেই আলোয় বাবার হাসিমাখা মুখ এখনও ভেসে আছে।

একদিন এক ছোট্ট মেয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করল,

— “আপু, এই হারিকেনটি প্রতিদিন কেন জ্বালান?”

জোৎস্না মৃদু হেসে বললেন,

— “কারণ কিছু আলো বিদ্যুতে জ্বলে না, জ্বলে স্মৃতিতে। আর সেই আলোই মানুষকে পথ দেখায়।”

সন্ধ্যার আকাশে তখন একে একে তারা ফুটছিল। জোৎস্না অনুভব করলেন—মানুষের জীবন একদিন শেষ হয়, কিন্তু তার ভালোবাসা, শিক্ষা ও স্নেহ স্মৃতির ভেতর অনন্ত আলোর মতো জ্বলতে থাকে।

সেই দিন থেকে গ্রামের মানুষ বলতে শুরু করল—

> “যে মানুষ ভালোবাসা দিয়ে যায়, সে কখনও হারিয়ে যায় না; সে স্মৃতির পাতায় আলো হয়ে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকে।”

— সমাপ্ত —

✍️ লিখনীতে: মিসেস চামেলি আক্তার প্রিয়া

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

রাজশাহীতে র‌্যাবের অভিযানে অপহৃত কিশোরী উদ্ধার

বাংলাদেশের সুপরিচিত ও জনপ্রিয় কবি-সাহিত্যিক মিসেস চামেলি আক্তার প্রিয়া অণুগল্প: স্মৃতির পাতায় আলো

Update Time : 11:16:30 pm, Saturday, 25 July 2026

✍️ লিখনীতে: মিসেস চামেলি আক্তার প্রিয়া

বাড়িটার উঠোনে এখন আর বিকেলের কোলাহল নেই। পুরোনো আমগাছটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার ছায়ায় আর কেউ গোল হয়ে বসে গল্প করে না। সময় যেন ধুলো হয়ে জমেছে বারান্দার প্রতিটি ইটে।

বহু বছর পর মিসেস মর্জিনা আক্তার জোৎস্না ফিরে এলেন তাঁর পৈতৃক বাড়িতে। শহরের ব্যস্ত জীবন তাঁকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পর বাড়িটি প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে।

একদিন পুরোনো কাঠের আলমারি গোছাতে গিয়ে তিনি একটি ছোট্ট টিনের বাক্স পেলেন। বাক্সের ভেতরে ছিল কয়েকটি বিবর্ণ ছবি, কিছু পুরোনো চিঠি এবং একটি হারিকেনের কাঁচ।

কাঁচটি হাতে নিয়েই তাঁর মনে পড়ে গেল সেই রাতগুলোর কথা। গ্রামের ঘন অন্ধকারে তখন বিদ্যুৎ থাকত না। বাবা হারিকেন জ্বালিয়ে বলতেন, — “আলো শুধু চোখে নয় মা, মনে জ্বালিয়ে রাখতে হয়।”

সেই আলোয় পড়াশোনা করেই একদিন মর্জিনা আক্তার জোৎস্না বড় হয়েছিলেন, শহরে চাকরি পেয়েছিলেন। কিন্তু সাফল্যের ব্যস্ততায় বাবার সেই কথাগুলো ধীরে ধীরে স্মৃতির আড়ালে হারিয়ে গিয়েছিল।

চিঠিগুলোর একটি খুলতেই বাবার হাতের লেখা চোখে পড়ল—

> “যেদিন আমি থাকব না, সেদিন যদি কখনও একা লাগে, তবে মনে রেখো—মানুষ চলে যায়, কিন্তু ভালোবাসা কখনও বাড়ি ছেড়ে যায় না। স্মৃতিই তখন পথ দেখায়।”

চোখের কোণে অশ্রু টলমল করে উঠল। এত বছর ধরে তিনি ভেবেছিলেন, স্মৃতি শুধু কষ্ট দেয়। কিন্তু সেদিন বুঝলেন—স্মৃতি আসলে অন্ধকারে জ্বলে থাকা একটি প্রদীপ, যার আলো কখনও নিভে যায় না।

পরদিন সকালে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, বাড়িটিকে আর পরিত্যক্ত থাকতে দেবেন না। গ্রামের শিশুদের জন্য গড়ে তুললেন একটি ছোট্ট পাঠাগার। নাম দিলেন “স্মৃতির পাতায় আলো”। বাবার পুরোনো বই, নিজের সংগ্রহ এবং মানুষের দানে ধীরে ধীরে পাঠাগারটি প্রাণ ফিরে পেল।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেখানে একটি হারিকেন জ্বালানো হতো। শিশুরা যখন বই পড়ত, জোৎস্নার মনে হতো—সেই আলোয় বাবার হাসিমাখা মুখ এখনও ভেসে আছে।

একদিন এক ছোট্ট মেয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করল,

— “আপু, এই হারিকেনটি প্রতিদিন কেন জ্বালান?”

জোৎস্না মৃদু হেসে বললেন,

— “কারণ কিছু আলো বিদ্যুতে জ্বলে না, জ্বলে স্মৃতিতে। আর সেই আলোই মানুষকে পথ দেখায়।”

সন্ধ্যার আকাশে তখন একে একে তারা ফুটছিল। জোৎস্না অনুভব করলেন—মানুষের জীবন একদিন শেষ হয়, কিন্তু তার ভালোবাসা, শিক্ষা ও স্নেহ স্মৃতির ভেতর অনন্ত আলোর মতো জ্বলতে থাকে।

সেই দিন থেকে গ্রামের মানুষ বলতে শুরু করল—

> “যে মানুষ ভালোবাসা দিয়ে যায়, সে কখনও হারিয়ে যায় না; সে স্মৃতির পাতায় আলো হয়ে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকে।”

— সমাপ্ত —

✍️ লিখনীতে: মিসেস চামেলি আক্তার প্রিয়া