Dhaka 5:37 pm, Thursday, 11 June 2026

রাজশাহী সিটিতে নিয়মবহির্ভূত নির্মাণে ৭২১টি ভবন চরম ঝুঁকিপূর্ণ

মোঃ সোহেল রানা, বার্তা বিভাগ:-

রাজশাহী মহানগরীতে গত দুই দশকে দ্রুত নগরায়ণের ফলে বহুতল ভবনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে নির্মাণ বিধিমালা ও নিরাপত্তা নির্দেশনা উপেক্ষা করে গড়ে ওঠা অসংখ্য ভবন এখন নগরবাসীর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর অন্তত ৭২১টি ভবন বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একসময় জীবন বীমা কর্পোরেশনের ভবনটিই ছিল রাজশাহীর একমাত্র ১০ তলা ভবন। বর্তমানে নগরজুড়ে বহুতল ভবনের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যথাযথ নির্মাণবিধি অনুসরণ করা হয়নি। অনেক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছাড়াই।

সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর উপশহর নিউমার্কেট মোড়ে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র ছাড়াই একটি ৯ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটির ফ্ল্যাট বিক্রি সম্পন্ন হওয়ার পর আরডিএ জানতে পারে যে এটি কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে সাহেববাজার এলাকার ১২ তলা এসএস টাওয়ারের বিরুদ্ধেও।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক ভবন মালিক সাত তলার অনুমোদন নিয়ে পরবর্তীতে আট থেকে ১০ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করছেন। এছাড়া ভবনের চারপাশে রাস্তা ও উন্মুক্ত স্থান রাখার বিধান থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না।

আরডিএর তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় বর্তমানে বহুতল ভবনের সংখ্যা ১ হাজার ২৪৫টি। এর মধ্যে ৮৪৮টি ভবন প্রয়োজনীয় রাস্তার জায়গা না রেখে নির্মাণ করা হয়েছে। অনুমোদনহীন ও নিয়মবহির্ভূত ভবন নির্মাণের অভিযোগে বর্তমানে ১৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

নগরবাসী ও সচেতন মহলের অভিযোগ, আরডিএর কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অনেক ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূতভাবে নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা ঘটলে এসব ভবনের আশপাশে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করতে পারবে না, ফলে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানির ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক জানান, বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিপণিবিতানসহ নগরীর ৭২১টি ভবন বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণের কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এ বিষয়ে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান বলেন, শুধু নোটিশ ও মামলা করেই দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। নিয়মবহির্ভূত অংশ অপসারণে আরডিএকে আরও কঠোর হতে হবে এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা জোরদার করতে হবে।

আরডিএর ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল তারিক জানান, গত পাঁচ বছরে দেড় শতাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ১৪০টি ভবনের বর্ধিত অংশ অপসারণ করা হয়েছে। নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।

আরডিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বলেন, অনুমোদনহীন ভবনের মালিকদের বিরুদ্ধে নোটিশ ও মামলা করতে কিছুটা সময় লাগে। তবে নিয়মবহির্ভূত সব বর্ধিত অংশ পর্যায়ক্রমে অপসারণ করা হবে। বর্তমানে কোনো কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে প্ল্যান পাস করানোর সুযোগ নেই বলেও তিনি দাবি করেন।

আরডিএ সূত্রে আরও জানা গেছে, গত এক দশকে নকশা বহির্ভূত বা অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের অভিযোগে রাজশাহীর সাড়ে ছয় হাজারের বেশি ভবন মালিককে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত নগরায়ণের পথে এসব অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবন বর্তমানে অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। :::

আরডিএ ও ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত বহু ভবন; দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির শঙ্কা বাড়ছে নগরজুড়ে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ভোলাহাটে কৃষি দপ্তরের আয়োজনে পার্টনার ফিল্ড স্কুল কংগ্রেস অনুষ্ঠিত

রাজশাহী সিটিতে নিয়মবহির্ভূত নির্মাণে ৭২১টি ভবন চরম ঝুঁকিপূর্ণ

Update Time : 03:19:03 pm, Thursday, 11 June 2026

মোঃ সোহেল রানা, বার্তা বিভাগ:-

রাজশাহী মহানগরীতে গত দুই দশকে দ্রুত নগরায়ণের ফলে বহুতল ভবনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে নির্মাণ বিধিমালা ও নিরাপত্তা নির্দেশনা উপেক্ষা করে গড়ে ওঠা অসংখ্য ভবন এখন নগরবাসীর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর অন্তত ৭২১টি ভবন বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একসময় জীবন বীমা কর্পোরেশনের ভবনটিই ছিল রাজশাহীর একমাত্র ১০ তলা ভবন। বর্তমানে নগরজুড়ে বহুতল ভবনের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যথাযথ নির্মাণবিধি অনুসরণ করা হয়নি। অনেক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছাড়াই।

সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর উপশহর নিউমার্কেট মোড়ে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র ছাড়াই একটি ৯ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটির ফ্ল্যাট বিক্রি সম্পন্ন হওয়ার পর আরডিএ জানতে পারে যে এটি কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে সাহেববাজার এলাকার ১২ তলা এসএস টাওয়ারের বিরুদ্ধেও।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক ভবন মালিক সাত তলার অনুমোদন নিয়ে পরবর্তীতে আট থেকে ১০ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করছেন। এছাড়া ভবনের চারপাশে রাস্তা ও উন্মুক্ত স্থান রাখার বিধান থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না।

আরডিএর তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় বর্তমানে বহুতল ভবনের সংখ্যা ১ হাজার ২৪৫টি। এর মধ্যে ৮৪৮টি ভবন প্রয়োজনীয় রাস্তার জায়গা না রেখে নির্মাণ করা হয়েছে। অনুমোদনহীন ও নিয়মবহির্ভূত ভবন নির্মাণের অভিযোগে বর্তমানে ১৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

নগরবাসী ও সচেতন মহলের অভিযোগ, আরডিএর কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অনেক ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূতভাবে নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা ঘটলে এসব ভবনের আশপাশে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করতে পারবে না, ফলে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানির ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক জানান, বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিপণিবিতানসহ নগরীর ৭২১টি ভবন বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণের কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এ বিষয়ে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান বলেন, শুধু নোটিশ ও মামলা করেই দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। নিয়মবহির্ভূত অংশ অপসারণে আরডিএকে আরও কঠোর হতে হবে এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা জোরদার করতে হবে।

আরডিএর ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল তারিক জানান, গত পাঁচ বছরে দেড় শতাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ১৪০টি ভবনের বর্ধিত অংশ অপসারণ করা হয়েছে। নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।

আরডিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বলেন, অনুমোদনহীন ভবনের মালিকদের বিরুদ্ধে নোটিশ ও মামলা করতে কিছুটা সময় লাগে। তবে নিয়মবহির্ভূত সব বর্ধিত অংশ পর্যায়ক্রমে অপসারণ করা হবে। বর্তমানে কোনো কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে প্ল্যান পাস করানোর সুযোগ নেই বলেও তিনি দাবি করেন।

আরডিএ সূত্রে আরও জানা গেছে, গত এক দশকে নকশা বহির্ভূত বা অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের অভিযোগে রাজশাহীর সাড়ে ছয় হাজারের বেশি ভবন মালিককে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত নগরায়ণের পথে এসব অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবন বর্তমানে অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। :::

আরডিএ ও ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত বহু ভবন; দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির শঙ্কা বাড়ছে নগরজুড়ে।