Dhaka 12:04 am, Tuesday, 21 April 2026

সন্নাসী চরে আধিকাল থেকে বর্তমান কালের কিছু অজানা কথা

সন্নাসী চরে আধিকাল থেকে বর্তমান কালের কিছু অজানা কথা


নিজস্ব প্রতিবেদক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা

 

শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি কর্মে, মর্মের প্রতিটি সাধনায় সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্যকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন মহাত্মা। এ প্রসঙ্গে পরিষ্কার তার বক্তব্য— হিন্দু-মুসলিম ইউনিটি হ্যাজ বিন মাই প্যাশন ফরম মাই আর্লি ইয়ুথ। আই মে নট লিভ সিঙ্গল স্টোন আনটার্নড টু অ্যাচিভ ইট’। এই কাঙ্ক্ষিত ঐক্য আর ঐক্যচিন্তাকে স্বরাজের, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও অহিংসা আন্দোলনের প্রবলতম শক্তি ভেবে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। এটাই তার সত্যসাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য। এখানেই গান্ধীজি ভারত ইতিহাসের অন্তর্নিহিত গভীর বার্তার বাহক ও সাধক। ধর্মাসক্ত গান্ধীজির ঈশ্বর বিশেষ কোনো সম্প্রদায়ের নন, তিনি সকলের প্রতিটি ধর্মাবলম্বীর অনিঃশেষ আশ্রয়। তার সত্যবোধের পরিপন্থীদের সতর্ক করে তিনি বলেছিলেন, যারা দ্বিজাতিতত্ত্বের কথা বলেছেন, ‘পাপ তাদের ঘিরে আছে।…মাই হোল সোল রিভেলস অ্যাগেইনস্ট দি আইডিয়া দ্যাট হিন্দুজ অ্যান্ড মুসলিমস রিপ্রেজেন্ট টু অ্যান্টাগোনিসটিক কালচারস অ্যান্ড ডক্টরিনস। টু অ্যাসেসন্ট টু সাচ অ্যা ডক্টরিন ইজ ফর মি ডিনায়েল অফ গড। ফর আই বিলিভ উইথ মাই হোল সোল দ্যাট দ্য গড অফ কুরআন ইজ অলসো দ্য গড অফ দ্য গীতা, অ্যান্ড দ্যাট উই আর অল, নো মেটার বাই হোয়াট নেম ডিজাইনড চিলড্রেন অফ দ্য সেম গড।’

 

১৯১৫ সালে, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে এসে ভেতরের সত্যানুভূতির সাধনাকে অধিকতর গুরুত্ব দিতে থাকলেন গান্ধীজি। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রবলতম মন্ত্র হয়ে উঠল তার ঐক্যপ্রীতির বার্তা। ঈশ্বরহীন নেহরুও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে থাকলেন। মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের প্রতিনিধি মুসলিম লীগ কিংবা বিভিন্ন উগ্র হিন্দু সংগঠন গান্ধীজিকে পথের কাঁটা ভাবতে থাকল। তলে তলে তাকে খতম করার ছক কষল। ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত, ১৪ বছরে ছ’বার মহাত্মাকে খুন করার চক্রান্ত হয়। ১৯৪৮-এর ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় দিল্লির বিড়লাভবনে প্রার্থনা সভায় যোগ দেবার পথে আর এস এস সদস্য নাথুরাম গডসের গুলিতে খুন হবার আগে ১৯৪৪-এর সেপ্টেম্বর এবং ১৯৪৮-এর ২০ জানুয়ারিতে দু’বার ব্যর্থ হয় নাথুরামের চেষ্টা। মহাত্মার মৃত্যুর পর ওই আততায়ী আত্মকৈফিয়ত খাড়া করে বলেছিল, গান্ধীজি আলাদা মুসলিম রাষ্ট্র গড়ে তোলার দাবিকে সমর্থন করেছিলেন বলেই সে তাকে হত্যা করে।

 

ইতিহাসের যেকোনো গভীর পড়ুয়া জানেন, গান্ধীজি দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণাকে কখনও মেনে নিতে পারেননি। ‘মুসলিম রাষ্ট্রের’ দাবিদাররা বলতেন, গান্ধী হিন্দুদের নেতা, তাই তিনি পাকিস্তান সৃষ্টির প্রবল বিরোধী। আর উগ্র হিন্দুরাও ভাবতেন, তিনি সাম্প্রদায়িক সংহতির কথা বলে মুসলিম তোষণকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তার মানে উভয় সম্প্রদায়ের অসহিষ্ণুতার পূজারিরা মহাত্মাকে শত্রু ভাবত কিন্তু সাধারণ মানুষ ওইসব অসত্য ধারণাকে আমল দেয়নি। গান্ধীজি তাদের নজরে ত্রাণকর্তা এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের আপসহীন প্রবক্তা। তাঁর এই ভাবমূর্তি আজও অক্ষত। হিংসার বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই, তাঁর ভেতরের রক্তক্ষরণ, তাঁর আত্মত্যাগ, তাঁর সত্যতত্ত্ব গোটা বিশ্বে বহু গণআন্দোলনের পরম আশ্রয়। সন্ত্রাস আর রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত বাড়ছে, ততই গান্ধীজির অহিংসার প্রাসঙ্গিকতা মুক্তিকামী মানুষের ভরসা হয়ে উঠছে। এভাবেই গান্ধীজির ভাবাদর্শ ছুঁয়ে আছে যুক্তি আর বিবেককে। এরকম প্রজ্ঞা, এরকম কর্মময় সন্ন্যাসী গত হাজার বছরের ইতিহাস কোথাও দেখেনি।

 

গান্ধীজি ধর্মপ্রবর্তক নন। প্রতিটি বড়ো, সংগঠিত ধর্মের সারাংশকে অন্তরের সত্যের সঙ্গে একাকার করে যে দর্শনের জন্ম দিয়েছেন, তার আধুনিকতা, তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নহীন। হিংসায় উন্মত্ত, নৈরাজ্যের কবলে পড়ে দিকভ্রষ্ট যে-কোনো দেশে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সত্যপ্রীতি ও সাধনা দিকশিখার ভূমিকা পালন করবে। সমাজ বার বার তাঁর দিকে ফিরে তাকাবে, অবাক বিস্ময়ে। খুঁজতে তার দর্শনের উত্স আর বিস্তারের মহিমা। তাঁর সমকাল যা এখন অতীত, তাঁর সঙ্গ লাভ নয়, ওই ইতিহাস, ওই সব ঘটনাপ্রবাহ, ওই অভিজ্ঞতা স্পর্শ করে খতিয়ে দেখবে রাষ্ট্র আর সমাজের অবস্থান এবং নিজেই নিজের ভাগ্যলিপি রচনা করবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ফাউন্ডেশন রাঙ্গামাটি জেলার আয়োজনে শাহাদাত বার্ষিকী আলোচনা মিলাদ অনুষ্ঠিত হয়েছে

সন্নাসী চরে আধিকাল থেকে বর্তমান কালের কিছু অজানা কথা

Update Time : 01:32:49 pm, Monday, 12 January 2026

সন্নাসী চরে আধিকাল থেকে বর্তমান কালের কিছু অজানা কথা


নিজস্ব প্রতিবেদক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা

 

শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি কর্মে, মর্মের প্রতিটি সাধনায় সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্যকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন মহাত্মা। এ প্রসঙ্গে পরিষ্কার তার বক্তব্য— হিন্দু-মুসলিম ইউনিটি হ্যাজ বিন মাই প্যাশন ফরম মাই আর্লি ইয়ুথ। আই মে নট লিভ সিঙ্গল স্টোন আনটার্নড টু অ্যাচিভ ইট’। এই কাঙ্ক্ষিত ঐক্য আর ঐক্যচিন্তাকে স্বরাজের, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও অহিংসা আন্দোলনের প্রবলতম শক্তি ভেবে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। এটাই তার সত্যসাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য। এখানেই গান্ধীজি ভারত ইতিহাসের অন্তর্নিহিত গভীর বার্তার বাহক ও সাধক। ধর্মাসক্ত গান্ধীজির ঈশ্বর বিশেষ কোনো সম্প্রদায়ের নন, তিনি সকলের প্রতিটি ধর্মাবলম্বীর অনিঃশেষ আশ্রয়। তার সত্যবোধের পরিপন্থীদের সতর্ক করে তিনি বলেছিলেন, যারা দ্বিজাতিতত্ত্বের কথা বলেছেন, ‘পাপ তাদের ঘিরে আছে।…মাই হোল সোল রিভেলস অ্যাগেইনস্ট দি আইডিয়া দ্যাট হিন্দুজ অ্যান্ড মুসলিমস রিপ্রেজেন্ট টু অ্যান্টাগোনিসটিক কালচারস অ্যান্ড ডক্টরিনস। টু অ্যাসেসন্ট টু সাচ অ্যা ডক্টরিন ইজ ফর মি ডিনায়েল অফ গড। ফর আই বিলিভ উইথ মাই হোল সোল দ্যাট দ্য গড অফ কুরআন ইজ অলসো দ্য গড অফ দ্য গীতা, অ্যান্ড দ্যাট উই আর অল, নো মেটার বাই হোয়াট নেম ডিজাইনড চিলড্রেন অফ দ্য সেম গড।’

 

১৯১৫ সালে, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে এসে ভেতরের সত্যানুভূতির সাধনাকে অধিকতর গুরুত্ব দিতে থাকলেন গান্ধীজি। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রবলতম মন্ত্র হয়ে উঠল তার ঐক্যপ্রীতির বার্তা। ঈশ্বরহীন নেহরুও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে থাকলেন। মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের প্রতিনিধি মুসলিম লীগ কিংবা বিভিন্ন উগ্র হিন্দু সংগঠন গান্ধীজিকে পথের কাঁটা ভাবতে থাকল। তলে তলে তাকে খতম করার ছক কষল। ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত, ১৪ বছরে ছ’বার মহাত্মাকে খুন করার চক্রান্ত হয়। ১৯৪৮-এর ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় দিল্লির বিড়লাভবনে প্রার্থনা সভায় যোগ দেবার পথে আর এস এস সদস্য নাথুরাম গডসের গুলিতে খুন হবার আগে ১৯৪৪-এর সেপ্টেম্বর এবং ১৯৪৮-এর ২০ জানুয়ারিতে দু’বার ব্যর্থ হয় নাথুরামের চেষ্টা। মহাত্মার মৃত্যুর পর ওই আততায়ী আত্মকৈফিয়ত খাড়া করে বলেছিল, গান্ধীজি আলাদা মুসলিম রাষ্ট্র গড়ে তোলার দাবিকে সমর্থন করেছিলেন বলেই সে তাকে হত্যা করে।

 

ইতিহাসের যেকোনো গভীর পড়ুয়া জানেন, গান্ধীজি দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণাকে কখনও মেনে নিতে পারেননি। ‘মুসলিম রাষ্ট্রের’ দাবিদাররা বলতেন, গান্ধী হিন্দুদের নেতা, তাই তিনি পাকিস্তান সৃষ্টির প্রবল বিরোধী। আর উগ্র হিন্দুরাও ভাবতেন, তিনি সাম্প্রদায়িক সংহতির কথা বলে মুসলিম তোষণকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তার মানে উভয় সম্প্রদায়ের অসহিষ্ণুতার পূজারিরা মহাত্মাকে শত্রু ভাবত কিন্তু সাধারণ মানুষ ওইসব অসত্য ধারণাকে আমল দেয়নি। গান্ধীজি তাদের নজরে ত্রাণকর্তা এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের আপসহীন প্রবক্তা। তাঁর এই ভাবমূর্তি আজও অক্ষত। হিংসার বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই, তাঁর ভেতরের রক্তক্ষরণ, তাঁর আত্মত্যাগ, তাঁর সত্যতত্ত্ব গোটা বিশ্বে বহু গণআন্দোলনের পরম আশ্রয়। সন্ত্রাস আর রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত বাড়ছে, ততই গান্ধীজির অহিংসার প্রাসঙ্গিকতা মুক্তিকামী মানুষের ভরসা হয়ে উঠছে। এভাবেই গান্ধীজির ভাবাদর্শ ছুঁয়ে আছে যুক্তি আর বিবেককে। এরকম প্রজ্ঞা, এরকম কর্মময় সন্ন্যাসী গত হাজার বছরের ইতিহাস কোথাও দেখেনি।

 

গান্ধীজি ধর্মপ্রবর্তক নন। প্রতিটি বড়ো, সংগঠিত ধর্মের সারাংশকে অন্তরের সত্যের সঙ্গে একাকার করে যে দর্শনের জন্ম দিয়েছেন, তার আধুনিকতা, তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নহীন। হিংসায় উন্মত্ত, নৈরাজ্যের কবলে পড়ে দিকভ্রষ্ট যে-কোনো দেশে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সত্যপ্রীতি ও সাধনা দিকশিখার ভূমিকা পালন করবে। সমাজ বার বার তাঁর দিকে ফিরে তাকাবে, অবাক বিস্ময়ে। খুঁজতে তার দর্শনের উত্স আর বিস্তারের মহিমা। তাঁর সমকাল যা এখন অতীত, তাঁর সঙ্গ লাভ নয়, ওই ইতিহাস, ওই সব ঘটনাপ্রবাহ, ওই অভিজ্ঞতা স্পর্শ করে খতিয়ে দেখবে রাষ্ট্র আর সমাজের অবস্থান এবং নিজেই নিজের ভাগ্যলিপি রচনা করবে।